মো. আল-আমিন
গেল ডিসেম্বরে চীনের উহানে উত্পত্তি হয়ে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুতগতিতে। মহামারি ঠেকাতে লকডাউন, ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কারফিউ জারি করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। ফলে বিশ্বের শত কোটি মানুষ এখন কার্যত গৃহবন্দি। উত্পাদন কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির। ফলে গত এক শতাব্দিতে এ রকম অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর কখনো দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যাবে এবারের অর্থনৈতিক স্থবিরতা। ইতিমধ্যে বিশ্বে মন্দা শুরু হয়ে গেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে এ বছর বিশ্বে প্রবৃদ্ধি না হয়ে বরং ৩ শতাংশ সংকোচন ঘটবে। গত ৬০ বছরের মধ্যে এবার এশিয়া ‘শূন্য’ প্রবৃদ্ধি দেখতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক এ ধাক্কা বাংলাদেশেও লাগবে। বিশ্বের সার্বিক অর্থনীতির এই যখন অবস্থা, উন্নত দেশগুলো যখন অবশ্যাম্ভাবী মন্দার ভয়াবহতা আঁচ করছে তখন আমাদের দেশের কি হতে পারে তা সত্যিই অনেক কঠিন। ইতিমধ্যে করোনার প্রভাবে কলকারখানা, পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। দিনমজুর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাজ না থাকায় বহু বেকার হয়ে পড়েছে। আমাদের রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক নির্ভর। করোনার ছোবল এই খাতটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্ডার বাতিল হওয়া, স্থগিত হওয়ার ফলে ভবিষ্যতও অনিশ্চিত। মহামারি শেষ হলেও এসব দেশ থেকে অর্ডার আসতে সময় লাগবে এটাই অনুমেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিশাল প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। তবে এই প্রণোদনার সুফল তখনই মিলবে যখন এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে। লকডাউন উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার ঠিক রাখতে এখনই পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের শ্রমশক্তির এটি বড়ো অংশ বেকার হতে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, লকডাউন উঠে গেলে স্বল্পকালীন কর্মসংস্থানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মসৃজনি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে হতদরিদ্রদের আয় বাড়াতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেকারদের ভাতা প্রদান, পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ ধরনের নগদ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মন্দাকালীন সময়েও তারা টিকে থাকবে। দেশে ১০ টাকা কেজির চালসহ স্বল্প খরচে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পাশাপাশি কৃষি উত্পাদনও ঠিক রাখতে হবে। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ঠিক রাখতে কৃষিখাতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কৃষিপণ্য উত্পাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে পারলে দেশে খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। আসছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক না পেলে কৃষকদের সংকট বাড়বে। স্বল্পকালীন কর্মসৃজনি প্রকল্পে কৃষিখাতে মৌসুমি শ্রমিকদের ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া কৃষি প্রণোদনার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনে সহায়তা দেওয়া হলে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঠিক থাকবে। কারণ কৃষিপণ্যে ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকরা পরের বছর ফসল উত্পাদনে নিরুত্সাহিত হবে।
