করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আতংকে যখন দেশের মানুষ দিশেহারা তখন একটি অসাধু চক্র কারসাজি করে প্রতিনিয়ত চালের দাম বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি চালের দাম বাড়ানোর একটি চক্রকে চিহ্নিত করা হলেও শুধুমাত্র ভর্ত্সনা ও সতর্ক করেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার চাল নিয়ে কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আগেই।
দেশে চালের সবচেয়ে বড় মোকাম কৃষ্টিয়ার খাজানগর। মূলত দেশের চালের বাজার এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। বিভিন্ন সময় খাজানগরের কতিপয় চাল কল মালিকদের বিরুদ্ধে চালের দাম বৃদ্ধি ও অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। কোন কারণ ছাড়াই গত দুই মাসে এই মোকামে চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চাল কল মালিকরা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদ্য শেষ হওয়া আমন মৌসুমে চাল কল মালিকরা ধানের দাম বৃদ্ধি ও ধান সংকটসহ নানা অজুহাতে দফায় দফায় চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়ীদের এসব করাসাজির সাথে নতুনভাবে যোগ হয় করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব। মিনিকেটসহ সব ধরনের চালের দাম তিন থেকে চার দফায় বাড়ানো হয়। যার প্রভাব পড়ে রাজধানীসহ সারাদেশের চালের বাজারে। বিষয়টি নিয়ে প্রায় মাসখানেক আগে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অটো রাইচসহ মিল মালিক ও চেম্বার অব কমার্স প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চালের দাম যেন বাজারে কেজি প্রতি ৫০ টাকার উপরে না উঠে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও চালের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে।
সরকারের বিপনন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বাজারে সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৬০ থেকে ৬৮ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা ৫০ থেকে ৫৮ টাকা ও মোটা চার ইরি/স্বর্ণা ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও সব ধরনের চাল গতকালের দামের তুলনায় কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। সরকারের এই সংস্থাটির হিসেবে গত এক মাসের ব্যবধানে নাজিরশাইল/মিনিকেটের দাম ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, পাইজাম/লতা ৭ শতাংশ ও ইরি/স্বর্ণা ২১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে হঠাত্ করে আবার চালের দাম বাড়ায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার চালের মোকামে নজরদারি বাড়ায় প্রশাসন। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেনের নেতৃত্বে বাজার মনিটরিং টিম গত ১১ এপ্রিল খাজানগর মোকামে অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, পূর্ব অঙ্গীকার ও বাজার মনিটরিং টিমের নির্দেশনা না মেনে রশিদ এ্যাগ্রো ফুড তাদের মিলে ৫০ টাকার জায়গায় ৫২ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করছে। এ সময় মনিটরিং টিম বাড়তি দামে চাল বিক্রির চালান জব্দ করেন। পরে জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন রশিদ এ্যাগ্রো ফুডের সত্বাধিকারী আব্দুর রশিদসহ জেলা চালকল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে ডেকে বৈঠক করেন। বৈঠকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আব্দুর রশিদের কাছে জানতে চান প্রতি কেজি নির্ধারিত ৫০ টাকার উপরে কেন চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে রশিদ এগ্রো’র সত্ত্বাধিকারী কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে ডিসি তাকে ভর্ত্সনাসহ কঠোরভাবে সতর্ক করেন। কিন্তু কারসাজি করে চালের দাম বাড়ানোর জন্য তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগেও রশিদ এ্যাগ্রোর বিরুদ্ধে কারসাজি করে চালের দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠলেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও রশিদ এগ্রো’র মালিক বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করে আসছেন।
বৈঠকে কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোয়ার হোসেন, কুষ্টিয়া জেলা অটো মেজর এন্ড হাস্কিং মিলের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি হাজী ওমর ফারুক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন জানান, কারসাজির মাধ্যমে কেউ যেন চালের বাজার দর উর্ধ্বগতি কিংবা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।
