দুর্যোগে মৃত ব্যক্তির মরদেহ ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ২১:৫০

মোহাম্মাদ আবদুল ওয়াজেদ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২-তে দুর্যোগ পরবর্তী কার্যক্রম যথাযথ পালন করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। দুর্যোগ পরবর্তী কার্যক্রমগুলোর অন্যতম হলো দুর্যোগের কারণে মৃত ব্যক্তির লাশের সত্কার করা। যথা— মুসলমান হলে জানাজা শেষে দাফন করা, হিন্দু হলে আগুনে পোড়ানো এবং অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে সেই ধর্মের বিধান মতে সত্কারের ব্যবস্থা। অনেক সময় অবস্থা এমন হতে পারে যে, কারো একার পক্ষে এমনকি পরিবারের পক্ষেও মরদেহ দাফন-কাফন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের সাইক্লোনে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ ব্যবস্থাপনায় বেশ বেগ পেতে হয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ভেঙে পড়ে প্রায় ১১০০ পোশাক-শ্রমিকের মৃত্যু হলে তাদের উদ্ধারকৃত মরদেহ দাফন-কাফন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির কারিগরি সহায়তা নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ‘দুর্যোগ পরবর্তী মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০১৬’ প্রণয়ন ও প্রকাশ করে। দুর্যোগের সংজ্ঞা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস একটি দুর্যোগ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২-এর ধারা ২ (১১)-তে দুর্যোগ (Disaster)-এর সংজ্ঞা হলো— প্রাকতিক, মনুষ্যসৃষ্ট অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এমন ঘটনা বা আপদ (Hazard) যার ফলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও জীবনযাত্রা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে বাইরের সাহায্য ছাড়া তাদের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব হয় না। আইনে ছয়টি আপদের কথা বলা হয়েছে যার ২ (১১)(ই)-তে বলা হয়েছে, ‘মহামারি সৃষ্টিকারী ব্যাধি, যেমন প্যান্ডেমিক ইনফ্লুয়েঞ্জা, বার্ড ফ্লু, অ্যানথ্রাক্স, ডায়রিয়া, কলেরা, ইত্যাদি।’ এটা পরিষ্কার যে করোনা ভাইরাসজনিত মহামারি একটি দুর্যোগ।  সুতরাং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন করোনা সংকট মোকাবিলায় প্রয়োগ করা হবে—এটাই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় মৃতের দাফন-কাফন নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিছু গুজবের কারণে কবরস্থানে লাশ দাফনে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কোথাও করোনা আক্রান্ত মৃতের দাফন না করার জন্য কবরস্থানে ব্যানার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

‘দুর্যোগ পরবর্তী মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০১৬’-এর অধ্যায় ৩-এ সংক্রমিত রোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘যে কোনো দুর্যোগের পর মৃতদেহের মাধ্যমে মহামারির সৃষ্টি হতে পারে মর্মে সাধারণ ধারণা রয়েছে। তবে এর পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই (অনুচ্ছেদ ৩.১.১)।’ বলা হয়েছে, ‘মহামারি সম্ভাবনার এ গুজবটি গণমাধ্যম কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং দুর্যোগে সাড়াদানে অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমেও প্রচারিত হতে পারে’ (অনুচ্ছেদ ৩.১.৩)। আরো বলা হয়েছে যে, সংক্রমিত রোগের কারণে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানো হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য তা মানসিক যন্ত্রণা বাড়িয়ে তোলে। আর এ ধরনের গুজব কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন—দ্রুত গণকবর, তথাকথিত জীবাণুনাশক ছিটানো ইত্যাদি করতে বাধ্য করে (৩.১.৪)। দেশের গণমাধ্যমগুলোতে যেভাবে প্রচার হয়েছে তাতে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতির সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ নেই।

নির্দেশিকার অধ্যায় ৩-এর শেষ অংশে ‘জনগণের ঝুঁকি’ শীর্ষক অংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেহেতু সাধারণ জনগণ মৃতদেহের সংস্পর্শে আসে না, তাই তাদের ঝুঁকি খুবই সামান্য (৩.৩.১)। বাংলাদেশের সংক্রমণজনিত রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং  গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) করোনা আক্রান্ত মরদেহের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা তথা দাফন-কাফনের বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দিয়েছে এবং সে মতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং এ বিষয়ে অহেতুক উদ্বেগ প্রকাশ করা বা গুজব না ছড়ানো কাম্য। দুর্যোগ পরবর্তী মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০১৬- এর ৩.৪ ও ৩.৫ অনুচ্ছেদে সংক্রামক রোগে মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তির মরদেহ বহন করা ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় এ ধরনের মরদেহ বহনের সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অন্যান্য দুর্যোগে সাড়া প্রদানের বেলা যে ব্যবস্থা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ও স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টারস অনুযায়ী নেওয়া হয়, তেমনি দুর্যোগ পরবর্তী মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন ও সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এজন্য ‘জেলা দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ’, ‘সিটি করপোরেশন দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ’, ‘উপজেলা দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ’ এবং ‘পৌরসভা দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ’ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এসব গ্রুপে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ স্কাউট/ বিএনসিসি, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত আছেন। কর্মপরিধি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘সিটি করপোরেশন ওয়ার্ড মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ নামে নতুন একটি কমিটি গঠন ও গুরুত্বপূর্ণ এ কমিটির কার্যপরিধি উল্লেখ করা হয়েছে। এ কমিটিতে অন্যান্য প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিটি ইউনিটের প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত। আশা করা যায়, উল্লিখিত কমিটিগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে করোনা ভাইরাসজনিত মৃত্যুর কারণে মরদেহ সত্কারের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না।

n লেখক :সাবেক পরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর