আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল
বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড়ো আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। দিনের পর দিন পুরো বিশ্বে এ ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করে চলছে। ফলে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বড়ো বড়ো দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও অচলাবস্থা শুরু হয়েছে। তবে বৈশাখ মাসের আগমনে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মাঝে শুরু হয় নদীভাঙনের এক অজানা আতঙ্ক। নিমিষেই ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল বিলীন হয়ে যায় নদীর গর্ভে। সে আতঙ্কও কম ছিল না।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে নদীভাঙন একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে নদীভাঙন। এছাড়া বাতাসে নদীর স্রোতের গতি বৃদ্ধি পেলে ভাঙতে শুরু করে বেড়িবাঁধ। আবার জোয়ারের সময় ঘূর্ণিঝড় হলে বিশাল রূপ ধারণ করে নদীভাঙন। তাই বৈশাখ মাসের আগমনে ‘কালবৈশাখী’ ঝড়ের আভাস পেয়ে করোনার মধ্যে নদীভাঙনের আতঙ্কে দিনযাপন করছে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ।
এর আগে, ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলায় দক্ষিণ জনপদের উপকূলীয় অঞ্চল লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণ উপকূলীয় বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনা জেলার কয়রা উপজেলা। এতে গোটা উপজেলা লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া নদীতে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি সব বিলীন হয়ে যায়। ফলে ফসলশূন্য হয়ে উঠে এ এলাকা। সেসময় প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার বেড়িবাঁধের ওপর মানবেতর জীবনযাপন করেছে। তবে আইলার এত বছর পরেও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ঐ দিনটির কথা মনে হলে আজও ভয়ে শিউরে ওঠেন এ অঞ্চলের মানুষ।
প্রলয়ংকরী সেই আইলার ক্ষত কিছুটা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের এসব মানুষ। এ এলাকার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধে পর্যাপ্ত মাটি নেই। ফলে আইলার পরেও কয়েক বার নদীভাঙনের কবলে পড়েছেন তারা। তাদের মতে, স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ না দেওয়ায় বার বার নদীভাঙনের কবলে পড়তে হয়। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় মাটি দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়ায় বেড়িবাঁধগুলো এখনো ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর মধ্যে কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ কাছারি বাড়ি থেকে মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা ও একই ইউনিয়নের দশালিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদীর বেড়িবাঁধগুলো অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সকল বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। ফলে এসব বাঁধ ভেঙে আবারও গোটা উপজেলা লোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সবাইকে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করারও সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করেই নদীভাঙন প্রতিরোধে স্বেচ্ছায় কাজ করেছে এলাকার মানুষ।
উপকূলীয় অঞ্চলের এসব বাসিন্দাদের দাবি, করোনা ভাইরাসের চেয়ে নদীভাঙনের ভয়াবহতা বেশি। তাদের অভিমত, ‘নদীভাঙনে এলাকার সব কিছু শেষ হয়ে যায়। এর আগে বন্যার পানিতে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এ এলাকায় স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয় না। যখন বেড়িবাঁধের অবস্থা খুব খারাপ হয়, তখন নিজেদের চেষ্টায় বাঁধ দেয় এলাকাবাসী। অনেক বার প্রশাসনের সাহায্য চেয়েও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।’
এখন আবার বেড়িবাঁধের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। তাই তারা করোনা ভাইরাসের ভয়ে ঘরে বসে না থেকে দুর্বল বেড়িবাঁধ মজবুত করতে গেছে। সরকার স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করলে আগের মতো কয়রা নদীর পানিতে প্লাবিত হবে না।
n লেখক : শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
