মাঠের ফসল ঘরে তোলাই বড়ো চ্যালেঞ্জ!

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ২১:৫০

শাহাদাত সুমন

উচ্চফলনশীল জাতের ধান প্রবর্তনের পর থেকে ধান আবাদ তথা পুরো কৃষিব্যবস্থার মস্ত বড়ো একটা পরিবর্তন এসেছে। আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে রবি মৌসুমে প্রচলিত ফসল যেমন ডাল, তেলবীজ, শাক-সবজি, ফলমূল, গোলআলু, মসলা ইত্যাদির আবাদ। তাই ধান ছাড়া অন্য শস্যকে সংকট মোকাবিলায় বিবেচনার সুযোগ কম। দেশের মোট উত্পাদিত ৩ দশমিক ৬৪ কোটি টন ধানের মধ্যে ৫৪ শতাংশই (প্রায় ১ দশমিক ৯৬ কোটি টন) বোরো চাষিদের দখলে। সারাদেশে এ বছর শুধু বোরো ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রাই ছিল ২ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন।

দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যান এবং ধান কাটার বিনিময়ে পারিশ্রমিক ও কিছু ধান নিয়ে আসেন। সাধারণত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে এসব শ্রমিক এলাকা থেকে রওনা দেন। কিন্তু দেশব্যাপী লকডাউনে বাস, ট্রেনসহ গণপরিবহন  চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা কাজের এলাকায় যেতে পারছেন না। এছাড়া অনেকেই এখন নিজ নিজ গ্রামে চলে গেছেন। এখন তারা কীভাবে ধান কাটার জায়গাগুলোতে যাবেন এবং করোনা সতর্কতা অবলম্বন করে খাদ্যের ঝুঁকি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করবেন তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিবেচনায় নেওয়ার দাবি কৃষকদের।

কৃষকেরা বলছেন, সরকারের এখনই উচিত হবে মাঠপর্যায়ে ফসল কাটা ও সংগ্রহের জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া, যাতে করোনা সতর্কতার সঙ্গে ফসল ঘরে ওঠাতে পারে। না হলে তাদের বছরব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

এছাড়া খুলনার কয়রাসহ লবণাক্ত এসব অঞ্চলের মানুষ উত্তরবঙ্গ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর অঞ্চলে বছরে দুবার ধান কেটে নিজেদের সংসার চালান। লকডাউনে তারা ফসল কাটতে না যেতে পারলে বছরের অন্যতম আয়ের মৌসুম হারাবেন তারা।

ধান কাটার পর সাধারণত একে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকিয়ে এর বীজের আর্দ্রতা কমিয়ে আনা হয়, যেন একে গোলাজাত করার পর কোনো ছত্রাকজাতীয় রোগ আক্রমণ করতে না পারে কিংবা যেন পচে না যায়। এরপর ঢেঁকির সাহায্যে কিংবা মাড়াইকরণ যন্ত্রের সাহায্যে এর খোসা ছাড়ানো হয়। এ কাজেও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয় এ মৌসুমকে কেন্দ্র করে।

এজন্য প্রয়োজনে ধান কাটার শ্রমিকদের উপজেলা পর্যায়ে করোনা ভাইরাস চেকআপের মাধ্যমে ঐ সব অঞ্চলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। যেন তারা বাহক হয়ে অন্য অঞ্চলে করোনা ভাইরাসের বিস্তার না ঘটান। এছাড়া ধান কাটাকালীন তাদের ঐ অঞ্চলের সাইক্লোন সেন্টার বা আইসোলেটেড ঘরে মৌসুম জুড়ে থাকার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। অন্যথায় তারা ঐ অঞ্চলের আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে নিজের এলাকাকে সংক্রমিত করবে।

তবে শুধু শ্রমিকদের কথা চিন্তা করারও অবকাশ নেই আমাদের। বেশির ভাগ কৃষক পরিবারের এই মুহূর্তে নেই ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার মতো অর্থ। শ্রমিকের অভাবে পাকা ধান খেতে পড়ে রয়েছে। যথাসময়ে ধান কাটতে না পারলে বিপাকে পড়বেন এমন অনেক কৃষক।

এছাড়া ফসল তোলার আগে শেষ সময়ের সেচের দরকার পড়ে। অনেক প্রান্তিক কৃষক মহাজনের কাছে ফসলের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার শর্তে সেচের ব্যবস্থা করেন। ফলে উত্পাদন ব্যয় অনেকাংশে বাড়ে।

সস্প্রতি কৃষকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রোণোদনা প্যাকেজ সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা হলেও বোরো চাষিদের জন্য সেটি সুসংবাদ হয়ে আসেনি। আগত আমন মৌসুমের প্রস্তুতিতে ব্যয় হবে সিংহভাগই।

তবে উত্পাদিত বোরো ধানের সংগ্রহে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে একদিকে যেমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে, সেই সঙ্গে আমন চাষের জন্য জমি প্রস্তুতিতে দেখা দেবে অনিশ্চয়তা। এজন্য যেকোনো একটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় ও সুযোগ আমাদের হাতে কম। সরকারের উচিত হবে প্রান্তিক বোরো চাষিদেরও এ প্যাকেজের আওতায় এনে পর্যাপ্ত কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে তাদের ফসলের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে সার্বিক বিষয়কে নিয়ন্ত্রণে আনা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়