দেশে প্রতিদিন বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সংক্রমণ প্রতিরোধে জরুরি প্রয়োজনীয় সেবা ছাড়া প্রায় সবকিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে জনসমাগম এড়াতে। এতেই বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ। বিশেষ করে গত কয়েকদিন ধরেই সন্ধ্যার পর অসহায় মানুষকে পথে পথে ঘুরতে দেখা যায়। ঘরে খাবার না থাকা, ঠিকমতো ত্রাণ না পাওয়া এবং কাজ না থাকায় উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই পথে নামতে হচ্ছে তাদের।
এ ব্যাপারে হাতিরপুল এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরেই সন্ধ্যার পর কিছু মানুষকে রাস্তায় দেখি। ছয়তলার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি রাস্তায় মধ্যবয়সি এক নারী জোরে জোরে হাঁক ছেড়ে ডাকতে থাকেন, ‘আপাগো, ও বড়োলোক আপারা, একটু ভাত দিবেন আপা!’ আবার ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ ক্ষুধার যন্ত্রণায় জোরে জোরে চিত্কার করেন, ‘বাবাগো, আইজ দুই দিন কিছু খাই নাই বাবা। একটু ভাত দিবেন গো কেউ!’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না রুবাইয়াত বলেন, এমন কয়েকজন মানুষকে এ এলাকায়ও দেখা যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। সন্ধ্যার পর অনেকটা নীরবে বাসার নিচে এসে তারা ডাক দেন, ‘আপা আমি এক রিকশাচালক, ঘরে কোনো খাবার নাই। একটু সাহায্য করবেন!’ শুধু হাতিরপুল বা মোহাম্মদপুর নয়, দেখা গেছে রাজধানীর অনেক এলাকায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। খাবারের অভাবে অনেকটা বাধ্য হয়েই পথে নামছেন তারা। আবার বাইরে থাকা নিষেধ করায় রাতে থাকার জায়গারও অভাব হচ্ছে অনেকের।
আনোয়ার আলী নামে এক জন ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই মেয়ে, এক ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ভেতরে বসবাস করতেন তিনি। বর্তমানে স্টেডিয়াম বন্ধ করে দেওয়ায় তারা রমনা মার্কেটের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু এখানেও তারা থাকতে পারছেন না পুলিশের ভয়ে।
এদিকে খাবার আর একটু অর্থ সাহায্যের জন্য চিত্কার করে সাহায্য চাইতে থাকা মধ্যবয়সি আরিফুর রহমান বলেন, ‘অসুস্থ মা আর দুই ছোটোবোন নিয়ে সংসার আমার। বাবা মারা যাওয়ার পর রাজমিস্ত্রির কাজ করে আমি সংসার চালাই। এক বোন অষ্টম শ্রেণিতে আর আরেক বোন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুব বিপদে পড়েছি। বাড়িওয়ালা ভাড়া চেয়েছে। যদিও ৩ হাজার টাকার ভাড়ার ১ হাজার দিতে বলেছে, তাও আমার কাছে নেই। ঘরে একমুঠো চাল ছাড়া অন্য কোনো খাবারও নেই। বাধ্য হয়েই এভাবে রাস্তায় রাস্তায় সাহায্য চাইতে নেমেছি। কখনো ভাবিনি এভাবে এক দিন রাস্তায় নামতে হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাদিন ত্রাণের অপেক্ষায় রাস্তার পাশে বসে থেকে শেষে ত্রাণ না পেয়ে পথে নামছেন এসব মানুষ। এসব অসহায় মানুষের অধিকাংশই খোঁজ জানেন না সরকারি ত্রাণের। একইসঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন স্থানে যেসব ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, সেটিও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
এ ব্যাপারে রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরির কাজ চলছে। খেটে খাওয়া অভাবী মানুষ এলাকায় যারা রয়েছেন, পর্যায়ক্রমে সবাইকেই সাহায্য দেওয়া হবে। আর এ সংকটের সময়ে ত্রাণের সুষ্ঠু এবং সমন্বিত বণ্টন প্রয়োজন বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
