বাংলাদেশে গত ১৮ মার্চ ২০২০ হইতে তিন সপ্তাহের মধ্যে ৯ মাস হইতে ১০ বত্সরের নিচের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ শিশুকে এক ডোজ করিয়া ‘এমআর টিকা’ দেওয়ার ক্যাম্পেইন পরিচালিত হইবার কথা ছিল; কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে হাম ও রুবেলার এই টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক হইয়াছে তাহা লইয়া এখন প্রশ্ন উঠিয়াছে। কেননা ইতিমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে এই দুই রোগে আক্রান্ত হইয়া শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়াছে। খাগড়াছড়িতে হামে এক শিশুর মৃত্যুসহ অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া রাঙ্গামাটির সাজেক ইউনিয়নের ১০-১২টি গ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হইতে এই পর্যন্ত সেইখানে আট শিশু মারা যায় এবং আক্রান্ত হয় আরো আড়াই শতাধিক। হামও একটি ভাইরাসজনিত রোগ। ইহার কারণে কাশি, ফুসকুড়ি ও জ্বর দেখা দেয়। সাধারণত আক্রান্ত রোগীর হাঁচি-কাশি হইতে আশপাশের সুস্থ মানুষের শরীরে ইহা ছড়াইয়া পড়ে। শিশুরা বেশি আক্রান্ত হইলে বড়োরাও ইহাতে আক্রান্ত হইতে পারে।
করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৪টি দেশ হাম ও রুবেলার টিকাদান কার্যক্রম দেরিতে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে নির্দেশনা ছিল তাহা হইল—যেই সকল দেশে হামের উপদ্রব নাই, সেই সকল দেশ করোনা মহামারির সময় এই ধরনের প্রতিষেধক দেওয়ার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখিতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশে এই বত্সর ছোঁয়াচে রোগ হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব আবার বাড়িয়া গিয়াছে। তাই এই ব্যাপারে সেই নির্দেশনা আর কার্যকর নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে সমগ্র বিশ্বেই হামে আক্রান্ত হইবার ঘটনা বাড়িয়া গিয়াছে। ২০১৮ সালে ১ লক্ষ ৪০ হাজারেরও অধিক মানুষ হামে আক্রান্ত হইয়া মারা গিয়াছে। যাহার বেশির ভাগই হইল বাচ্চা ও শিশু। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ইহার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাইয়াছে। জানা যায়, বাংলাদেশে ২০০৬ ও ২০১০ সালে হাম টিকাদান কর্মসূচি এবং ২০১৪ সালে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এই কারণে হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব অনেকটা হ্রাস পায়। এখন আবার ইহার প্রকোপ যে বাড়িয়াছে তাহা গত বত্সরের এক পরিসংখ্যান হইতে উপলব্ধি করা যায়। যেই সকল শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাহিরে থাকিতেছে, তাহাদের কারণেও ঝুঁকি বাড়িয়া যাইতেছে।
উল্লেখ্য, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের দিক হইতে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কারণে দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর পাশাপাশি পঙ্গুত্ব রোধ করা সম্ভব হইতেছে। এই সফলতার জন্য গত বত্সর ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার দিয়াছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)। টিকাদানের কারণে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত হইয়াছে। সুতরাং আমরা আশা করি, হাম-রুবেলাও একদিন পুরাপুরি দূর হইবে দেশ হইতে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলে চলমান হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন আরো জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যান্য অঞ্চলেও অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার জন্য সর্বপ্রকার প্রস্তুতি থাকিতে হইবে।
