নারায়ণগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি আতঙ্কজনক। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন জেলার তিন ম্যাজিস্ট্রেট। মারা গেছেন ত্রাণ শাখার এক কর্মচারী। আক্রান্তদের এক জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া তাবাসসুম। এক বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়েকে ঢাকায় মায়ের কাছে রেখে করোনা প্রতিরোধে কাজ করেছেন। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ভাইরাসে। পাশাপাশি আক্রান্ত হয়েছেন তার মা ও স্বামী।
গতকাল সোমবার রাতে হোম আইসোলেশনে থাকা এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার ফেসবুক আইডি থেকে কোভিড-১৯ যুদ্ধ ও জনসেবায় প্রশাসন শীর্ষক একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘করোনার ভয়াল থাবা এসে পড়তে দেরি নেই, সবাই প্রস্তুত হও, সরকারের নির্দেশ। সরকারের কর্মচারী তাই পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। আমার এক বছরের তাইফ ও তিন বছরের নামিরাকে মায়ের কাছে ঢাকায় রেখে নারায়ণগঞ্জে থাকতে শুরু করলাম। ফটোসেশন, ফেসবুক পোস্ট বাহুল্য এড়িয়ে চলেছি। আমি খুব নিভৃতচারী তাই কাজকে প্রাধান্য দিয়েছি আগে। ’
তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্রী ছিলাম বলে জীবাণু নিয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা রাখি বলে দাবি করি। জীবাণুভীতিটাও তাই সরিয়ে রেখে কাজ করতে পেরেছি বোধ হয়। সারাদিনের চেষ্টা ক্লান্তি শেষে যখন দেখতাম লোকজন কথা শুনছে না, একই ব্যক্তি নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে আসছে, ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে ত্রাণ চাইছে আর প্রশাসনের সব কাজ নিয়েই, ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ অপপ্রচার, তখন শুধু নতুন উদ্যমে হাতড়ে খুঁজে বেড়াতাম। কিন্তু খারাপ লাগা ঘিরে ধরত যখন ভিডিও কলে সন্তানের মুখ আর প্রিয় স্বরগুলো শুনতে পেতাম। নিজের চেয়ে বেশি ভাবতাম পরিবারকে নিয়ে। জানেন কত রাতে ঘুমাতে পারিনি। শারীরিক মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বলও হয়ে পড়েছিলাম। তার মধ্যে সারা দেশে প্রশাসন বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন নাকি পিপিই চোর। অথচ ডিসি স্যার নিজ উদ্যোগে আমাদের সেটা যোগাড় ক?রে দিয়েছিলেন। যাই হোক ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকু নিয়েই কাজ চালিয়ে গিয়েছি, সব প্রশাসন যোদ্ধারাও সারাদেশে তাই করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মুসলমান হিসেবে মৃত্যু ভয় মনে রাখিনি, প্রিয় নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রাণ বাঁচাতেই দৌড়ে বেড়িয়েছি। নিজ জেলা চাঁদপুর, কিন্তু কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জকে যখন লোকে বাংলাদেশের উহান বলছে তখন বুকটা মুচড়ে ওঠে। আপনাদের সেবা করতে গিয়ে আজ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারী আক্রান্ত, ত্রাণ কাজের একজন পরিশ্রমী কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেছেন। এখনো মনে পড়ছে শেষ যেদিন সন্ধ্যায় কাশিপুর, গোগনগর এলাকায় মোবাইল কোর্ট করছিলাম মাইকে চিত্কার করে বলছিলাম প্রিয় নারায়ণগঞ্জবাসী, এ জেলার অবস্থা আর কত খারাপ হলে আপনারা সচেতন হবেন! আজ আমি, আমার পরিবার (স্বামী, মা), প্রশাসন কোভিড-১৯ আক্রান্ত। আমাদের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ পাওয়ার পর আত্মীয়, বন্ধু বিশেষ করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন যেভাবে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। আল্লাহ যেন দ্রুত আবার সুস্থ করে দেন, দেশের সেবা করার তৌফিক দেন। তাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভালো থাকুক নারায়ণগঞ্জ, ভালো থাকুক প্রিয় দেশ। সবাই আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন। সাধারণ এ জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত পার করেছি। সন্তান দুটো জন্ম দিতে গিয়ে দুই দুবার মৃত্যুর মুখ থেকে আল্লাহ ফিরিয়ে দিয়েছেন ওদের ভাগ্যে। আবার যেন আমরা প্রিয় মুখগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারি, আল্লাহ যেন সবাইকে তার রহমতের ছায়ায় রাখেন। আমিন।
