মহামারিতে রমজান কীভাবে কাটাবেন

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২০, ২১:৩৪

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের প্রতি সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা বাকারা-১৮৩)

পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানের জন্য রমজান এক বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ মাস। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানগণ মহান রবের ফরজ বিধান পালন করে থাকে। পাড়া-মহল্লা কিংবা গ্রামের ছোটো-বড়ো মসজিদে মুসল্লিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ধনী-গরিব সবার মনে স্বর্গীয় সুখ অনুভব হয় এবং আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম রমজান মাস এসেছে, যেখানে মুসলমানগণ করোনা নামক এক প্রাণঘাতী মহামারি ভাইরাসের কারণে মসজিদে যাওয়া তো দূরের কথা, ঘর থেকে বের হতেই পারবে না।

হাদিছে রাসুল (স) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ হা/৪০১৯) সুতরাং করোনা ভাইরাস আমাদের জন্য এখন পরীক্ষাস্বরূপ। হতে পারে এই রমজান মাস সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাস। তাই এই পরিস্থিতিতে রমজান মাস কীভাবে কাটানো উচিত, সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে।

১. হাদিছ থেকে পাওয়া যায়, রমজান মাসে আল্লাহ আসমানের দরজা খুলে দেন, রহমত নাযিল করেন, শয়তানকে বন্দি করেন, জান্নাতের দরজা খুলে দেন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। এ মাসে প্রতিদিন দুই জন ফেরেস্তা বলতে থাকেন, ‘হে কল্যাণের অভিযাত্রী, কল্যাণের পথে অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের অভিযাত্রী, থেমে যাও।’ আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানসহ পুণ্যের আশায় রমজানের সিয়ামব্রত পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি হা/ ৩৮)

যেহেতু আল্লাহ সিয়ামের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমা করেন, সেহেতু রমজানে সিয়াম অবস্থায় পাপাচার ত্যাগ করতে না পারলে সিয়ামের কোনো ফায়দা হবে না। স্বয়ং রাসুল (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজে কথা বা আমল ছাড়তে পারল না, তার পানাহারে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (মিশকাত হা/১৯৯৯) সেজন্য আল্লাহর দরবারে পাপ বর্জন করে বেশি বেশি তওবা পাঠ করতে হবে। রাসুল (স) প্রতিদিন ১০০ বার তওবা পাঠ করে ক্ষমা চাইতেন, অথচ তিনি মাসুম ছিলেন। সিয়াম অবস্থায় আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন। করোনা আমাদের পাপাচারের ফলস্বরূপ দুই হাতের কামাই। এখন পর্যন্ত যার কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি বিধায় এর একমাত্র প্রতিষেধক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং  রমজানের অছিলায় বেশি বেশি তওবা পাঠ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। যাতে তিনি অনুগ্রহ করে আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্তি দেন।

২. রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে তারাবিহ, ইতিক্বাফ ও শবে ক্বদর। তারাবিহ ও শবে ক্বদরের ব্যাপারে হাদিছে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে পূণ্যের আশায় তারাবিহ সালাত আদায় করে, অপর হাদিছে এসেছে, যে ব্যক্তি শবে ক্বদরের রাত্রি জাগরণ করবে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে।’ (মুসলিম হা/ ৭৫৯, বুখারি হা/২০১৪) বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সমস্ত ইবাদত অবশ্যই বাড়িতে আদায় করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, তারাবিহ এবং শবে ক্বদরের রাত্রি জাগরণ প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাতে আদায় করুন। বলা বাহুল্য, ইতিক্বাফ জুমআ মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিধায় বাড়িতে ইতিক্বাফ হবে না। অনেকেই মসজিদে যেতে নিষেধ করায় মনঃক্ষুণ্ন হচ্ছেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না যে স্বয়ং রাসুল (স) বৃষ্টিজনিত কারণে সাহাবিদের বাড়িতে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। (বুখারি হা/৯০১) যেখানে করোনা ভাইরাস একটা প্রাণঘাতী ভাইরাস, যা থেকে দূরে থাকা বা মসজিদে না যাওয়া অবশ্যই শতভাগ জায়েজ। কেননা, এটি ছোঁয়াচে রোগ। কুষ্ঠরোগও ছোঁয়াছে, যার বর্তমানে চিকিত্সা রয়েছে। অথচ রসুল (স) বলেছেন, ‘কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক।’ (বুখারি হা/৫৭০৭) সুতরাং আমাদের ঘরে থাকতে হবে এবং ইবাদতগুলো ঘরে আদায় করতে হবে—এ নির্দেশ স্বয়ং ইসলামের।

৩. বেশি বেশি দান ও কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। কমপক্ষে একবার সমস্ত কোরআন পড়ে খতম করা উচিত। রাসুল (স) রমজানে বেশি বেশি দান করতেন এবং জিবরাইল ফেরেস্তাকে প্রতিদিন কোরআন পড়ে শোনাতেন। (বুখারি হা/৩২২০)

৪. যারা করোনায় আক্রান্ত, তারা এই রমজানে সিয়াম না রেখে আল্লাহ হায়াত দিলে পরে যেকোনো সময়ে কাযা আদায় করতে পারবেন। কিন্তু পারতপক্ষে অন্যান্য ইবাদত করতে হবে। ঠিকমতো না পারলে কিংবা একেবারে অক্ষম হলেও অসুস্থ হওয়ার কারণে আল্লাহ পূর্ণ সওয়াব দেবেন। এই মর্মে বর্ণিত আছে, ‘বান্দা যখন পীড়িত হয় কিংবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য তা-ই লেখা হয়, যা সে আবাসে সুস্থ অবস্থায় আমল করত।’ (বুখারি-২৯৯৬) আর এই অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে যদি ধৈর্য ধরে ইমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, তবে শহিদ হওয়ার মর্যাদা লাভ করবে। (মুসলিম হা/১৯১৬)

৫. হাদিছ অনুসারে রমজানে রোজাদারকে ইফতার করালে ঐ ব্যক্তির সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়। (তিরমিযি হা/৮০৭) অন্যান্য বছরে মসজিদে ইফতার করানোর হিড়িক পড়ে। ইফতার করার জন্য মানুষ একে অপরের বাড়িতে, হোটেলে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। এ বছর অবশ্যই এ ধরনের জমায়েত করা থেকে বিরত থাকতে হবে, সেটা মসজিদে হোক কিংবা যে কোনো জায়গায়। বরং প্রয়োজনে প্রত্যেকে তাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা দরিদ্র ও অসহায়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের বাড়ি গিয়ে ইফতার ও সাদক্বাতুল ফিতর দিয়ে আসবেন। কোনো অবস্থাতেই করোনা আক্রান্ত বাড়িতে কিংবা এলাকায় প্রবেশ করা যাবে না এবং সেখান থেকে বের হওয়াও যাবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই ভয়ে ভীত হয়ে লকডাউন ভেঙে আক্রান্ত এলাকা থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন। এটি সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী কাজ। অবশ্যই আল্লাহর ওপর ভরসা করে ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, উসামাহ ইবনু যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি সা’দ (রা)-কে বলেন, একদিন রাসুল (স) মহামারি সম্পর্কে আলোচনার সময় বললেন, এ একটি শাস্তি, কতক জাতিকে এ দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তারপর এর কিছু অংশ বাকি রয়ে গেছে। তাই কখনো এ চলে যায় আবার কখনো তা ফিরে আসে। যখন কেউ কোনো এলাকায় মহামারির কথা শুনবে, তখন যেন সে সেখানে না যায়। আর যে কেউ এমন এলাকায় থাকে, যেখানে এর আক্রমণ ঘটেছে, তখন সে যেন সেখান থেকে পালিয়ে বের হয়ে না আসে।’ (বুখারি হা/৬৯৭৪)

lলেখক :মাস্টার্স (অধ্যয়নরত), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়