বিজ্ঞান হইল প্রবহমান নদীর মতো। দুই হাজার বত্সর পূর্বে বিজ্ঞানের কতখানি অগ্রগতি হইয়াছিল, ২০১৮ সালের শেষে আসিয়া সেই অগ্রগতির কী অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটিয়াছে—তাহা ন্যূনতম জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন যে কেহ বোঝেন। বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উল্লম্ফন ঘটিতেছে একঅর্থে প্রায় সমমাত্রায়।
একবিংশ শতাব্দী শুরুর পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা দেখিতে পাই বিস্ময়কর অগ্রগতি। দশ বত্সর পূর্বে যাহা ছিল বিলাসিতা, এখন তাহা নিত্যদিনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। একইভাবে এখন যাহা বিলাসিতা বা ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বলিয়া মনে হইতেছে, কয়েক বত্সর পর তাহাই যেন আমাদের নিত্যদিনের ছায়া হইয়া উঠিবে। যথারীতি ২০১৮ সালেও বিজ্ঞানের তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। প্রাত্যহিক জীবনের প্রভাব বিস্তারকারী প্রযুক্তি সাধারণত বেশি আলোচনায় আসে। কিন্তু এমন কিছু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নীরবে সাধিত হয়, যাহা মানবসভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ওজোন স্তরের যে ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধিত হইয়াছিল তিন দশক পূর্বে, তাহার বৃহত্ অংশের মেরামত হইয়াছে এই ২০১৮ সালেই। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি আশাপ্রদ। কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং বর্তমানে ব্যবহূত প্রথাগত কম্পিউটারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এই যে, প্রথাগত তথা ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারে তথ্যকে ০ এবং ১ ব্যবহার করিয়া কোড করা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্যকে কোয়ান্টাম বিটে কোড করা হয় ০ ও ১-এর উপরি-প্রয়োগ তথা সুপারপোজের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষমতা হইবে অপরিসীম, বর্তমানে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের যুগে একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে কোনো একটি স্থানে বসাইয়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থান হইতেও জটিল গণনার কাজ করা সম্ভবপর হইবে বলিয়া আশা করা যায়।
২০১৮ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। এই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স (এআই) বিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ—তাহা লইয়া বিস্তর বিতর্ক রহিয়াছে। প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল সম্প্রতি সতর্ক করিয়াছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যত্ লইয়া। ২০১৮ সালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মৃত্যুবরণ করিবার আগে সতর্ক করিয়া গিয়াছেন এআই প্রযুক্তির ব্যাপারে। এমনিতেই নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য এআই অনেক বড় ভূমিকা গ্রহণ করিবে অদূর ভবিষ্যতে। বিশেষ করিয়া আমাদের পারিবারিক দৈনন্দিন জীবনে বয়স্ক লোকজনদের দেখাশোনা অথবা শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করিতে রোবটের ব্যবহার ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করিবে। সামরিক খাতেও রোবটের নানাবিধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাইতেছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবটিকসের (আইএফআর) এক হিসাবে দেখা যায়, চার বত্সর আগে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ৪৭ লক্ষ রোবট বিক্রয় হইয়াছে। ২০১৯ সালের মধ্যে এই বিক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াইবে ৪ কোটি ২০ লক্ষে। এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইহা মামুলি ব্যবহার। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেই ধারায় বিকশিত হইতেছে, তাহা ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে মানুষের কর্মসংস্থান হ্রাসসহ সমগ্র মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ হইয়া উঠিতে পারে।
তবে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল—দারিদ্র্য বিমোচনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিস্ময়কর অবদান রাখিতেছে। অত্যাসন্ন বত্সরটিতেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের কল্যাণের জন্য হউক—ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।
