মাহে রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। সারাদিন সিয়াম সাধনায় রত থেকে রাতে এশার নামাজের পর সব ক্লান্তি উপেক্ষা করে দীর্ঘ ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায়ে মশগুল হওয়া মহান স্রষ্টার প্রতি গভীর প্রেম ও পূর্ণ আনুগত্যের অপূর্ব নিদর্শন। প্রকৃত মুমিন তারাবির কষ্টে আনন্দ উপভোগ করেন এবং কোরআন নাজিলের মাসে তারাবির নামাজে দাঁড়িয়ে হাফেজ সাহেবগণের মধুমাখা কোরআনের তিলাওয়াত শ্রবণে নিজের আত্মাকে সতেজ ও শীতল করেন। তারাবির নামাজ যদিও রোজার অংশ নয়, কিন্তু মাহে রমজানের পূর্ণ বরকত অর্জনে তারাবির নামাজের বিকল্প নেই। তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে তারাবির নামাজ পড়তেন এবং সাহাবায়ে কিরামদের পড়তে উত্সাহিত করতেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) তারাবির নামাজের ব্যাপারে সাহাবিদের উত্সাহিত করতেন, কিন্তু জোরালো আদেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে কিয়াম করবে (অর্থাত্ তারাবির নামাজ আদায় করবে), তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারি, মুসলিম)
হজরত রাসুলে কারিম (স.) আরো ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াব অর্জনের আশায় রোজা রাখেন, তারাবির নামাজ পড়েন এবং ক্বদরের রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদত করেন, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করা হবে। (বুখারি, মুসলিম)
প্রিয় পাঠক! প্রিয়নবি (স.) তারাবির নামাজ নিয়মিত আদায় করতেন না, এই আশঙ্কায় যে তা উম্মতের ওপর ওয়াজিব হয়ে যাবে এবং উম্মতের জন্য কষ্টকর হবে। তাই তিনি ও তার সাহাবাগণ এশার নামাজের পর তারাবির নামাজ অধিকাংশ সময় একাকী পূর্ণ ২০ রাকাত আদায় করতেন। কখনো জামাতে পড়তেন, আবার মাঝে মাঝে বাদ দিতেন।
রাসুলে কারিম (স.)-এর ওফাতের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকাল এবং হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে এই নিয়মই বহাল ছিল। রমজানের কোনো এক রাতে খলিফা হজরত ওমর (রা.) মসজিদে নববিতে গমন করে দেখলেন, সাহাবায়ে কিরাম ছোটো ছোটো জামাতবদ্ধ হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে তারাবির নামাজ আদায় করছেন। অতঃপর হজরত ওমর (রা.) তত্কালীন সব সাহাবায়ে কিরামের পরামর্শ ও সম্মতিক্রমে বিখ্যাত সাহাবি হজরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)কে ইমাম নিযুক্ত করে সবাইকে তার পেছনে তারাবির নামাজ পড়তে আদেশ দেন। (বুখারি)
সাহাবাগণের ইজমার ভিত্তিতে সেদিন থেকে বাইতুল্লাহ, মসজিদে নববিসহ বিশ্বের প্রায় সব মসজিদে পূর্ণ ২০ রাকাত তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার রীতি প্রচলিত হয়।
সহিহ হাদিসের সূত্রে বর্ণিত আছে, বিখ্যাত সাহাবি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করতেন, অতঃপর বিতরের নামাজ পড়তেন। (বায়হাকি, মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা)
তারাবির নামাজে পূর্ণ এক খতম কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা স্বতন্ত্র সুন্নত। কোরআন নাজিলের মাসে বিনা ওজরে এই কোরআন খতম ছেড়ে দেওয়া আদৌ উচিত নয়।
সম্মানিত পাঠক! বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। চীনের উহান থেকে শুরু এই ভাইরাস অতিদ্রুত বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘বৈশ্বিক মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ও আতঙ্কের বিষয়। চিকিত্সাবিজ্ঞানীগণ এই সংক্রামক ও মরণব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবার মক্কা মদিনাসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে মসজিদে তারাবির জামাত সীমিত আকারে আয়োজন করা হয়েছে এবং নিজ ঘরে নামাজ আদায়ের প্রতি মুসুল্লিগণকে উত্সাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকেও ঘোষণা করা হয়েছে, প্রতি মসজিদে ইমামসহ সর্বোচ্চ ১২ জন তারাবির নামাজের জামাত আদায় করবেন এবং বাকি মুসুল্লিগণ নিজ নিজ ঘরে তারাবির নামাজ আদায় করবেন। সুতরাং স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রতি যত্নবান হয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পবিত্র মাহে রমজানুল মোবারকের তারাবির নামাজ আদায় করা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
n লেখক :মুফাসিসরে কুরআন, খতিব, মাসজিদুল কোরআন জামে মসজিদ, কাজলা (ভাঙ্গাপ্রেস), যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
প্রিন্সিপাল, মারকাযুল উলূম আজিজিয়া মাদরাসা,
কাজলা (ভাঙ্গাপ্রেস), যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
