উন্নয়নশীল দেশের উল্লম্ফন

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৯

উন্নয়নশীল দেশগুলির সমস্যার কোনো শেষ নাই। এই সকল দেশে শিল্পায়ন হইতে শুরু করিয়া পানির সুব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ, পুষ্টি, শিশুমৃত্যু, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ—সর্বক্ষেত্রেই সীমিত সামর্থ্য ও দক্ষতার সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। শিল্পোন্নত দেশগুলির সহিত এই সকল দেশের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও ব্যবস্থাপনায় রহিয়াছে বিস্তর পার্থক্য। এই সকল দেশ সাধারণত উষ্ণপ্রধান। ইহাদের নানা ধরনের ঋতুকালীন রোগবালাইও ফি বত্সর মোকাবিলা করিতে হয়। শিক্ষা খাত বরাবরই অর্থসংকটে ভুগিতে থাকে। অর্থাত্, সর্বক্ষেত্রেই এই সকল দেশকে অর্থাভাব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করিয়া থাকে। অধিকন্তু উন্নয়নশীল এই সকল দেশে সাধারণত অবকাঠামোগত দুর্বলতা তীব্র হইয়া থাকে। কারখানাগুলি থাকে অনিরাপদ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সরবরাহে থাকে অনিশ্চয়তা। ইহার সহিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থাকে ভঙ্গুর, যাহার কারণে বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হইয়া থাকে। আর যেই সকল ব্যবসা বিনিয়োগ করিতে আগাইয়া আসে তাহারাও এই দুর্বলতার সুযোগ লইয়া থাকে। দীর্ঘ সময়ের শ্রমের জন্য তাহারা স্বল্প মজুরি নির্ধারণ করিয়া থাকে। সরকারগুলিও তাহা মানিয়া লইতে বাধ্য হয়। আর বলাই বাহুল্য, এই সকল কারণে দেশের আয়করের ভিত্তি দুর্বল হইয়া থাকে। ইহার সহিত রাজনৈতিক অস্থিরতাও দেশগুলির জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে বাধা হইয়া দাঁড়ায়। ফলে ঔপনিবেশিক সময় হইতেই একটি দারিদ্র্য চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাইতে দেখা যাইতেছে উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশকে। এই সকল দেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ শিক্ষাবিমুখ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে নানা অজুহাত দিয়া, নানা ভুল তথ্য সরবরাহ করিয়া শান্ত এবং সন্তুষ্ট রাখিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন।

উন্নয়নশীল বিশ্বে আরো একটি সমস্যা প্রকট হইতে দেখা যায়। ইহাদের জাতীয় পর্যায়ে আয়ের সহিত ব্যয়ের হিসাবটা হইয়া থাকে দুর্বল। অনেক উন্নয়নশীল দেশে যেইভাবে অর্থ বাতাসে উড়ানো হইয়া থাকে, তাহা সুস্থির অর্থনৈতিক দেশগুলিকেও মাঝেমধ্যে চিন্তিত করিয়া তোলে। কারণ এই সকল দেশ আয় না করিয়া ব্যয় করিতে থাকে। তাহারা সর্বদাই সম্মুখে উপস্থিত সমস্যাবলির সাময়িক উপশম করিতে চেষ্টা করেন। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এই সকল দেশ পরিচালনাকারীদের গরিবের বন্ধু বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও ইহারা জনগণের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করিতে কোনো সুস্থির পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে ব্যর্থ হন। জনগণকে স্বাবলম্বী করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসৃষ্টি সম্পর্কিত যেই সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাহা একদিকে যেমন রাজনৈতিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হইয়া থাকে, তেমনি পরিকল্পনার বাস্তবায়নেও নানা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়।

সুতরাং যতকাল এই সকল দেশ সঠিক পরিকল্পনা ও যথাযথ বাস্তবায়নে যোগ্যতা অর্জন না করিবে, যতকাল তাহাদের মধ্যে আয় অনুসারে ব্যয় করিবার মানসিক স্থিরতা তৈরি না হইবে, যতকাল কর্ম পরিকল্পনায় সত্যিকারের গতি না আসিবে, ততকাল এই সকল দেশকে কানাগলিতেই ঘুরপাক খাইতে হইবে। ইহা একটি খুবই সরল হিসাব। বর্তমান বিশ্বে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে তাহাতে সামনের দিনগুলিতে Global Interdependence বা বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরশীলতার কথা ভুলিয়া যাইতে হইবে। নিজেদের পরিশ্রমে, নিজেদের দক্ষতায় সম্মুখে আগাইতে না পারিলে মহাসংকটে পড়িতে হইবে যে কোনো উন্নয়নশীল দেশকেই—ইহা মনে রাখা সকলের জন্যই জরুরি।