কৃষকের ফসলে শিক্ষার্থীদের মানবতার হাত

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২০, ২২:১২

নিউটন মজুমদার

গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার একটি গ্রামের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কিছু ছেলে কয়েকটি গ্রুপ করে গ্রীষ্মের এই কাঠফাটা রোদে কৃষকদের ধান কেটে ঘরে তুলে দেওয়ার কাজে ব্রতী হয়েছেন, যখন তারা জানতে পারেন এ বছর করোনা ভাইরাস আতঙ্কে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে চুক্তিভিত্তিক ধান কাটা শ্রমিকেরা তাদের এলাকায় আসবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এর দরুন কৃষকদের শুরু হয় বুকফাটা হাহাকার—কীভাবে তারা এ বছর তাদের কষ্টের ফসল ঘরে তুলবেন! সঙ্গে সঙ্গে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া এসব কৃষককে আশার আলো দেখান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটিকালীন বাড়িতে এসে বসে থাকা এসব শিক্ষার্থী। গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার শিক্ষার্থীরা মিলিত হয়ে কয়েকটা গ্রুপ তৈরি করেন এবং কৃষকদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক সামান্য পারিশ্রমিকের (বিঘা বা শতাংশপ্রতি নির্দিষ্ট টাকা) বিনিময়ে ধান কর্তন করা শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে সোনালি স্বপ্নে বুক বাঁধেন তাদেরই কৃষক পিতা-মাতা, ভাইবোন ও পরিবারগুলো।

 বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাস বাংলাদেশে কৃষকদের বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার মৌসুম। কিন্তু এ বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার দরুন মানুষ কার্যত লকডাউনে গৃহবন্দি কিংবা ভাইরাসটি মারাত্মক ছোঁয়াচে হওয়ার কারণে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নিরাপদ মনে করছেন না বিধায় এ বছর অধিকাংশ এলাকায় মৌসুমি চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা আসছেন না। এতে দেশের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে হাওর ও দক্ষিণবঙ্গের বিলাঞ্চলের কৃষকেরা বোরো ধান কেটে ঘরে তুলতে বিপাকে পড়েছেন। কারণ এসব অঞ্চলের ধানের চাষাবাদ তুলনামূলক নিম্নভূমিতে হয়ে থাকে, তাই এই ফসল পাহাড়ি ঢল কিংবা জোয়ারের পানিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের ধান কেটে ঘরে তুলে দেওয়ার এই মহতী উদ্যোগ সত্যি কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার করছে। বাংলাদেশের সর্বত্র এই ছুটির দিনে ঘরে বসে থাকা সব শিক্ষার্থী যদি এভাবে নিজ নিজ এলাকার কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ান, তাহলে এই বোরো মৌসুমে কৃষকদের ধান কেটে ঘরে তুলতে কোনো সমস্যাই পোহাতে হবে না। কারণ এখন দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী বাড়িতে অবস্থান করছেন, তাদের শ্রমশক্তি নিঃসন্দেহে ব্যাপক। ফলে তারা এগিয়ে এলে একদিকে কৃষকেরা যেমন উপকৃত হবেন, অন্যদিকে অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা পারিশ্রমিক থেকে কিছু অর্থও উপার্জন করতে পারবেন। আর কৃষকের ঘরে উঠবে তার স্বপ্নের সোনালি ফসল। হাসবে কৃষক, বাঁচবে সোনার বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এ বিষয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাদের উত্সাহিত করেছেন। এছাড়া প্রশাসনের উদ্যোগে ধান কাটা শ্রমিকদের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটতে পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় প্রায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান করে প্রায় সব উপজেলায় উন্নত জাপানি প্রযুক্তির কম্বাইন হার্ভেস্টার মেশিন প্রদান করা হচ্ছে, যার দ্বারা ঘণ্টায় এক একরেরও বেশি জমির ধান কাটা সম্ভব। এতে করে ধান কাটতে অনেক সময় ও শ্রমশক্তির সাশ্রয়সহ ব্যয় কমে এসেছে। ফলে এখন মাড়াইকৃত ধান ও খড়গুলো শুধু বাড়ি নিয়ে আসার শ্রমটুকু হলেই যথেষ্ট, যে শ্রমটুকু আমাদের শিক্ষার্থীরা অনায়াসে সরবরাহ করতে পারেন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি উত্সাহিত করতে হবে, পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াতে পারে। সবার হূদয়ে দেশ, জাতি, মা, মাটি ও মানুষের সেবা করার আন্তরিকতা থাকলে দুর্যোগের এই কঠিন সময়েও কৃষকদের ফসল ঘরে তুলতে কোনো অসুবিধাই হওয়ার কথা নয়। সবার মুখে ধ্বনিত হোক— কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

n লেখক :বিএসএস (সম্মান), এমএসএস, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ