একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলসহ মহাজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবারের এই ভোটের লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী গত ১০ ডিসেম্বর প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পরপরই শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা, শেষ হয়েছে ২৮ ডিসেম্বর সকাল আটটায়। এই সময়ে দেশের তিনশটি সংসদীয় আসনেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ও মহাসমারোহে প্রচারণা চালিয়েছেন মহাজোট মনোনীত প্রার্থীরা। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের প্রচারণা ছিল সীমিত। ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি আসনসহ দেশের অনেক আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা এবার প্রচারণায় নামেনইনি। কেন্দ্রীয়ভাবেও বিএনপি, ২০ দল কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা প্রচারণায় মনোযোগ না দিয়ে কেবল অভিযোগ জানাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে আর ইসিতে অভিযোগ করার মধ্যেই কার্যত নির্বাচনী প্রচারণার সময় পার করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
রাজধানীসহ সারাদেশে মহাজোট প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেলেও বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। ঢাকা মহানগরীতে কয়েকটি স্থানে খুব অল্প সংখ্যক কিংবা হাতে গোণার মতো পোস্টার চোখে পড়েছে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের। মির্জা আব্বাস, আফরোজা আব্বাস, সালাউদ্দিন আহমেদ, নবী উল্যাহ নবী, আবদুস সালাম, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও মোস্তফা মোহসীন মন্টুসহ ধানের শীষের কয়েকজন প্রার্থীর রাজধানীতে মোটামুটি প্রচারণা ছিল। বিশেষ করে, ঢাকা-১২ (তেজগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব একদিনের জন্যও প্রচারণায় নামেননি। শুধু মগবাজারে তার কয়েকটি পোস্টার চোখে পড়েছে। রাজধানীর মতো এই চিত্র প্রায় সারাদেশের। দৈনিক পত্রিকা আর টেলিভিশনের পর্দা ছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের চেহারা কিংবা প্রচারণা দেখেননি ভোটাররা।
প্রার্থীদের প্রচারণায় তেমন না নামার বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শনিবারও বলেছেন, প্রশাসন ও সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের একের পর এক হামলা, আক্রমণ, বাধা, গ্রেফতার, মামলা, হয়রানির কারণেই ধানের শীষের বেশিরভাগ প্রার্থী প্রচারণায় নামতে পারেনি। তার অভিযোগ- সরকার, আওয়ামী লীগ, ইসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের সব আসনে প্রচারণায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির অভিযোগ, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত মোট গ্রেফতার ১১ হাজার ৫০৬ জন, গায়েবি ও মিথ্যা মামলার সংখ্যা ৯৫৭টি। গতকাল একদিনেই বিভিন্ন জেলায় বানোয়াট মামলা দায়ের হয়েছে ৫৯টি এবং গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ১৭৭ জনকে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন গত ২১ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়ে বলেন, ওইদিন থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা ঢাকা মহানগরীতে ধানের শীষের প্রার্থীদের পক্ষে গণসংযোগে অংশ নেবেন ও পথসভা করবেন। করবেন সেই কর্মসূচি একদিনের জন্যও পালিত হয়নি। একইদিন ড. কামাল ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তবে জনসভা আয়োজনে শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রস্তুতি বা তত্পরতা দেখা যায়নি।
ভোট থেকে সরবো না, দুই নম্বরি না হলে আমরাই জিতব: ড. কামাল
এদিকে, গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, আমরা অবশ্যই আশা করি, আমরা জিতব, সবাই এখন পরিবর্তন-পরিবর্তন করে চিত্কার করছে। নির্বাচনে আমরাই জিতব যদি কোনো দুই নম্বরি না হয়। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ আমাদের পক্ষে ভোট দেবে। মানুষকে বলেন কী চাও? পরিবর্তন-এই শব্দটা তারা জোর গলায় বলে। চলেন, আপনারা পরীক্ষা করে দেখেন। এতেই প্রমাণ হয়, আমরা জিতব।’
ভোটারদের সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে ইসির প্রতি আহ্বান জানান ড. কামাল। কোনো কারণে নির্বাচনের মাঝপথে সরে যাবেন কি-না, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট আমরা নিজেরা কোনোভাবে ভোট থেকে সরে যাবো না।’
বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়
ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলন শেষে ড. কামাল হোসেন একই স্থানে বিদেশ থেকে যে সাংবাদিকরা বাংলাদেশের ভোটের খবর সংগ্রহ করতে এসেছেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বিকালে ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলনের আগে রাজধানীর পুরানা পল্টনের জামান টাওয়ারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির নেতারা। জানা গেছে, বৈঠকে সারা দেশের নির্বাচন কীভাবে মনিটরিং করা হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়।
১৬ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নেই
এবারের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট লড়ছে ২৮৪টি আসনে। কারণ উচ্চ আদালতের রায়ে প্রার্থিতা বাতিল স্থগিত হওয়ায় ১৬টি আসনে ফ্রন্টের প্রার্থী নেই। তবে শেষ মুহূর্তে বিএনপি ঢাকা-১ সহ এসব আসনের কয়েকটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি লড়ছে ২৫৮টি আসনে। তবে এই তালিকায় নিবন্ধনহারা জামায়াত ও নাগরিক ঐক্যের প্রার্থীরাও আছেন। বিএনপি শরিকদের সঙ্গে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছে ২৮৩টি আসনে। ২০ দল শরিক এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চট্টগ্রাম-১৪ আসনে লড়ছেন নিজস্ব দলীয় প্রতীক ‘ছাতা’ নিয়ে।
পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস
ভোটের আগ মুহূর্তে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতার মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভোটে থাকা না থাকার প্রশ্নে কোনো কোনো নেতার মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ফাঁস হওয়া বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও বরকত উল্যাহ বুলুর টেলিফোন আলাপের সূত্র ধরে এই বিষয়টি সামনে এসেছে।
মওদুদ আহমদের কথিত ফোনালাপের সূত্র ধরে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জানতে চান, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছে কি-না, জবাবে ড. কামাল বলেন, ‘এটা মোটেই ঠিক নয়। বিভেদের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ঐক্য আরও সুসংহত হয়েছে।’ একই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, নির্বাচন থেকে আমাদের কোনো প্রার্থী এতো বৈরী পরিবেশের মধ্যেও সরে যাননি এবং কেউ যাবেন না।’ বিএনপিতে নির্বাচন নিয়ে কোনো বিরোধ আছে কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুলও গতকাল বলেছেন, ‘কোনো বিরোধ নেই। এগুলো সরকারের কূটচাল।’
