কেউ একজন হাঁচি বা কাশি দিলেই আশেপাশের সবাই ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে। যেভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে তাতে কেউই আর নিরাপদ না। যে কেউ যে কোনো সময় আক্রান্ত হতে পারি। জগদ্দল পাথরের মতো অজানা এক ভয় বুকের ওপর চেপে বসে আছে।
বিগত শতক থেকে কিছু দেশ নিজেদের ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড বা প্রথম বিশ্ব হিসাবে দম্ভ দেখিয়ে আসছে। বাকিদের তারা বলছে থার্ড ওয়ার্ল্ড মানে তৃতীয় বিশ্ব। প্রথম বিশ্ব আজ আক্রান্ত আর মৃত্যুর মিছিলেও ফার্স্ট। সারা জীবন যে প্রাসাদের বাসিন্দারা হাতমোজা ছাড়া কারো সঙ্গে কমরমর্দন করতেই অবজ্ঞা দেখিয়েছেন, সেই বাকিংহাম প্যালেসও আক্রান্তের তালিকায়।
অর্থ থাকলেই বা প্রথম বিশ্বের নাগরিক হলেই যে আপনি নিরাপদ না, করোনা তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। চূড়ান্ত সাম্যবাদী আর মরণঘাতী এক ভাইরাসের নাম ‘করোনা’, যার কাছে ধনী-গরিব, মোড়ল-চাঁড়াল সব সমান।
করোনার থাবায় কলকারখানা, গাড়ি, নৌযান, উড়োজাহাজ এবং মানুষের চলাচল সীমিত হওয়ায় সব দেশের বায়ুমণ্ডল ও প্রকৃতি এরই মধ্যে যথেষ্ট সতেজ আর সবুজ হয়ে উঠেছে। মানুষের লাগাতার অত্যাচারে পিষ্ট প্রকৃতি এখন দম নেওয়ার সময় পেয়েছে।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক চুল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তাতে পরিবেশে যে পরিমাণে পারমাণবিক পদার্থ নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত পাঁচ শ পারমাণবিক বোমার সমান।
এই দুর্ঘটনার পর পরিবেশবাদীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রকৃতির অন্তত কয়েক শ বছর লাগবে। অথচ ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’র এক ভিডিওতে দেখা গেল, মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই ওখানে প্রকৃতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বোঝা গেল, প্রকৃতিকে তার মতো চলতে দিলে অনেক কিছুই সহজে সমাধান হয়ে যায়।
মহামারি করোনা সবকিছু স্তব্ধ করে দিয়েছে। সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাত-দিন কাজ করছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আর সাধারণ মানুষ সবাই মিলে যার যার অবস্থান থেকে যখন এই মহামারি মোকাবিলায় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কিছু মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে পুরো জাতি আজ কঠিন সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে। দ্রুত এবং কঠোর হস্তে এইসব প্রতিহত করা এখন আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে আমার নিজস্ব একটা মতামত আছে। যদিও এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা নেই, তবে যুক্তি কিছুটা আছে। আমরা যুগ যুগ ধরে নানা ধরনের বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে, গরুর গোয়ালঘরের রেডিয়েশানের মধ্যে বড়ো হয়েছি; লিড, ধুলাবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়া বুকে টেনে, মানুষ-পশুর বিষ্ঠার গন্ধ শুঁকে, যক্ষ্মা, কলেরা, গুটিবসন্ত, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার মতো মরণব্যাধি হজম করে বেঁচে আছি। এর ফলে উন্নত দেশের মানুষের তুলনায় আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। যদিও এই যুক্তি অতোটা জোরালো না, তবুও আমি এটা বিশ্বাস করি।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে ‘স্মল পক্স’, ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা’, ‘সার্স’, ‘ম্যালেরিয়া’ ইত্যাদি মহামারি পৃথিবীর বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অতঃপর বিজ্ঞানীরা সেসবের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে মানবজাতিকে রক্ষা করেছেন। এবারও করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হবে। ইতিমধ্যে এর লক্ষণও দেখতে পাচ্ছি। সবশেষে পৃথিবীর সব বিজ্ঞানীর জন্য শুভ কামনা তাঁরা যেন দ্রুত করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সক্ষম হন। কারণ মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে এর কোনো বিকল্প নাই। সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।
ঢাকা
ইত্তেফাক/জেডএইচ
