আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের মত ভোটের হাওয়া লেগেছে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতেও। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারার আনন্দে আত্মহারা দেশের সর্ববৃহত্ ছিটমহল কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়াসহ ১১১টি ছিটমহলের মানুষজন। হাট-বাজার, চায়ের দোকান সর্বত্রই চলা ভোটের আলোচনায় উঠে আসছে ছিটমহলবাসীদের ভাগ্য উন্নয়নের কথা। আজ রবিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যান্য ভোটারের সাথে ভোট প্রয়োগ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পারার আনন্দ যেন ভোটারদের মাঝে।
২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট মধ্যরাতে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও পঞ্চগড় জেলার ১১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩৭ হাজার ২৬৯ জন মানুষ। ছিটমহলগুলোতে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রায় ২২ হাজার মানুষ। এর মধ্যে দেশের সর্ববৃৃহত্ কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় ভোটারের সংখ্যা ৩ হাজার ১শ ৭২ জন।
দাসিয়ারছড়ার কামালপুর গ্রামের তরুণ ভোটাররা জানান, আমরা দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকার পর আলোর পথে ফিরে এসেছি। এটা শুধু সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। নতুন ভোটার হওয়ার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জীবনের প্রথম ভোট প্রয়োগ করে দেশের সরকার নির্বাচন করতে পারব বলে গর্ববোধ করছি।
দাসিয়ারছড়ার সমন্বয়পাড়া গ্রামের সাবেক পঞ্চায়েত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম (৬৫) জানান, জীবনে এই প্রথম বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করব। পরিবার-পরিজনসহ অন্যদের সাথে সমান অধিকার নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাব ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। দাসিয়ার ছড়ার বাসিন্দা নুরুন্নাহার বেগম (৬০), জয়নব বেওয়া (৭০) জানান, আমরা তো অধিকারহীন ভারতের নাগরিক ছিলাম। আমরা কখনও বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারব সেটা ভাবতেই পারিনি। কিন্তু বর্তমান সরকার ছিট বিনিময়ের পর আমাদের সকল ছিটবাসীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়েছে। আমরা এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারব এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করব এর চেয়ে খুশির বিষয় আর কিছু নেই।
ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা খান জানান, ৬৮ বছর আমাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছুই ছিল না। ছিটমহল বিনিময় বিলটি বাংলাদেশের সংসদে পাস করে এবং একইভাবে ভারতের সংসদেও বিলটি পাস হওয়ায় আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। এটি আমাদের গর্ব ও অহঙ্কার।
কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম রাকিব জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলের ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের বিলুপ্ত শালবাড়ি ছিটমহলের বাসিন্দা তোয়াছউদ্দিন। বয়স একশ পেরোলেও জীবনে কোনদিন ভোট দেননি। ভোট কিভাবে দিতে হয় জানেনও না। এবারই প্রথম ভোট দিবেন। একই ছিটমহলের শতবর্ষী নতুন বাংলাদেশি আফছার উদ্দিন বলেন, ৬৮ বছর ধরে বাংলাদেশি এলাকার নির্বাচনে ভোটের দৃশ্য দেখে আসছি। ভোট ব্যবস্থা চোখে দেখেছি। কিন্তু আমরা ভোট দিতে পারিনি। সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে। কষ্ট হলেও ভোট দিতে যাব। এবার ভোট দিব।
শালবাড়ি ছিটমহলের সিরাজুল ইসলাম বলেন, আগে দেশ ছিল না, ভোটাধিকারও ছিল না। নাগরিকত্ব পেলাম শেষ বয়সে এসে ভোটার হলাম। ছিটমহলে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে। দলবদ্ধভাবে এবার আমরা প্রথমবার ভোট দিব।
গৃহবধূ মলি বেগম বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসী হওয়ায় কোন সুযোগ সুবিধা পাইনি। এমনকি স্বাধীনভাবে যে চলাফেরা করব সেটারও কোন সুযোগ ছিল না। ৩ বছর হলো আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমরা ভোটার হয়েছি, ভোট দিতে পারবো এজন্য আমরা খুবই খুশি। বিলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিক আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ চাই নিরাপদে ভোট দিতে চাই। ভোট কেন্দ্রে যেন কোন গন্ডগোল না হয়। পঞ্চগড় জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, পঞ্চগড়-১ আসনে ৭টি এবং পঞ্চগড়-২ আসনে ২৯টি ছিটমহল রয়েছে। এসব ছিটমহলে মোট ভোটার ৮ হাজার ৯৩৫ জন । এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৪৬৭৪ জন এবং নারী ভোটার ৪২৬১ জন। নতুন বাংলাদেশিরা এবারই প্রথম ভোট প্রদান করবেন। এলাকায় উত্সবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
