বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের পশ্চিম সায়েড়া গ্রামের সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের বিকাশ চন্দ পাল আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকার পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরদিন ২ অক্টোবর তত্কালিন চারদলীয় ঐক্যজোটের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে তার বাড়ির সামনে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে। বাগেরহাট শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে দুই সপ্তাহ চিকিত্সা শেষে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। আর কোনোদিন দেশে ফেরেননি।
আবার ভোট এসেছে। পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তাই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বিকাশের বৃদ্ধ বাবা অধীর কুমার পাল (৭৭)। তিনি বলেন, জাতীয় ‘সংসদ নির্বাচনের কথা মনে পড়লে গায়ে কাপুনি আসে। আওয়ামী লীগ হেরে গেলে আমার ছেলেকে চোখের সামনে মার খেতে দেখেও আমরা সেদিন কিছুই করতে পারিনি। এবার কি হয় জানিনা।’
একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সায়েড়া মধুদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়াত সহকারী শিক্ষক জগদীশ চন্দ মন্ডলের পরিবারে। নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার ‘অপরাধে’ তার বড় ছেলে বিপ্লবকে হত্যার হুমকির মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। জগদীশ নিজেও ১৮ মাস ভারতে আত্মগোপণ করে দেশে ফেরেন। জগদীশ মন্ডলের ছোট ছেলে পল্লব এই প্রতিবেদককে বলেন, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হওয়ার কয়েকদিন পর বাবার সাবেক ছাত্ররা বাবা ও আমার বড় ভাইকে খুঁজতে বাড়িতে আসে। এরপর ভয়ে আমরা সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। আমাদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়াতেই যেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসে!
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচনের পর বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকার হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। তাদের উপর জোট সরকারের সন্ত্রাসীদের এই হামলা চলেছে তাদের ক্ষমতার পুরোটা সময় জুড়েই। কেউ প্রাণ হারায়, কারও যায় সম্ভ্রম। কারো পুকুরের মাছ আর গোলার ধানও লুটপাট হয়ে যায়। ওই নির্বাচনের পর অন্যতম আলোচিত ছিল মোরেলগঞ্জ উপজেলার চিংড়াখালির বাণিকান্ত মিস্ত্রী হত্যা ও সবিতা রাণী মন্ডলকে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দুটি। আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল করার অপরাধে বাণিকান্তকে জোট সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছিল। মোল্লাহাট উপজেলার গাওলা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত গাওলা গ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তারাপদ পোদ্দারের বাড়িতে সশস্ত্র হামলা, রামপালের ছবিরাণী নির্যাতন, যাত্রাপুরের কোমরপুরের ঠাকুরবাড়ি গণধর্ষণ, ডাকাতি ও হত্যাকান্ড এর কয়েকটা উদাহরণ মাত্র।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মিলন কুমার ব্যানার্জী এই প্রতিবেদককে বলেন, ওই সময়ে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় এলাকায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে খুন, হামলা, গনধর্ষণ, চাঁদাবাজির অসংখ্য ঘটনা ঘটে। অনেক পরিবার ভারতে পালিয়ে যায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অজানা ভয়ভীতি ও আতংক বিরাজ করে। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ রায় বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা পূজা উদযাপন ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সাথে প্রশাসন একাধিক সভা করেছে। সংখ্যালঘুদের ভয় পাওয়ার আর কোন কারন নেই।
