রহস্যময় করোনা এবং উহার অ্যান্টিবডির স্থায়িত্ব

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৩

সমগ্র বিশ্ব বহুলাংশে স্থবির হইয়া গিয়াছে, প্রতিটি মানুষের গৃহ হইয়া উঠিয়াছে এক-একটি কারাগার। হলিউডের সিনেমা কিংবা কল্পসাহিত্যে এমনটি দেখা যায়। বলা হইতেছে, তুমি যদি বাহিরে গিয়া করোনা ভাইরাসটিকে তোমার গৃহে ডাকিয়া না আনো, তাহা হইলে তুমি নিরাপদ থাকিবে। মুশকিল হইল, এইভাবে দিনের পর দিন সকল কিছু লকডাউন হইয়া থাকিলে করোনা ভাইরাস হাতে মারার চাইতে অধিক ভাতে মারিবে। অধিকাংশ কলকারখানার চাকা বন্ধ। উত্পাদন নাই তো কাজকর্ম নাই, কাজকর্ম নাই তো হাজিরা নাই, হাজিরা নাই তো চাকুরি নাই, আর চাকুরি নাই তো বেতন নাই। এইভাবে ‘নাই’য়ের তালিকা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘ করা যাইবে। সুতরাং করোনার করাল গ্রাস এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের জীবনে যে চরম অভিঘাত হিসাবে দেখা দিবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তাহা হইলে উপায় কী? উপায় হইল করোনা হইতে মুক্তির পথ খুঁজিতেই হইবে। ব্রিটেন প্রথমদিকে বলিয়াছিল হার্ড (Herd) ইমিউনিটির কথা। অর্থাত্ যত বেশি মানুষের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি তৈরি হইবে, ততই সেই অঞ্চল করোনা-ঝুঁকি হইতে মুক্ত থাকিবে। এই লকডাউনের মধ্যে করোনা হইতে সুস্থ হইয়া উঠা ব্যক্তিদের কাজে ফিরা এবং যাতায়াতের সুরাহা করিয়া দিতে জার্মানি, চিলি, ইতালির মতো বেশ কিছু দেশ ‘ইমিউনিটি পাসপোর্ট’  প্রদানের কথা ভাবিতে শুরু করিয়াছিল। ইহাকে বলা যায় ‘করোনার ঝুঁকিমুক্তির সনদ’। কিন্তু ইহাতেও বিপদের সম্ভাবনা দেখিতেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

প্রকৃতপক্ষে করোনা অত্যন্ত রহস্যময় ভাইরাস। ইহার গতিপ্রকৃতি এখনো বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করিতে পারেন নাই। এমনকি অঞ্চলভেদে ইহা ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করিয়া থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, সুস্থদের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হইলেই সেই অ্যান্টিবডি দ্বিতীয়বার সংক্রমণের হাত হইতে ঐ ব্যক্তিকে সুরক্ষা যে দিবেই—এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। এই ক্ষেত্রে আরো একটা জরুরি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। তাহা হইল, সকল অ্যান্টিবডিই ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারে না। বিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্বখ্যাত নেচার পত্রিকা কিছুদিন পূর্বে বলিয়াছে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা পাইতে প্রয়োজন নিউট্রিলাইজিং অ্যান্টিবডি। গবেষকেরা বলিতেছেন, মাম্পস, মিজলস, স্মল পক্সের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত ইমিউনিটি সারা জীবন থাকে। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে তাহা হয় না, যেই কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা ফি বত্সর দেখা দেয়।

যেহেতু কোভিড-১৯ ভাইরাসের বয়স মাত্র চার-পাঁচ মাস, তাই ইহার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া নিউট্রিলাইজিং অ্যান্টিবডির স্থায়িত্ব কত দিন হইবে, ইহা এখনো কেহ জানেন না। যদিও করোনা গোত্রের অন্য ভাইরাস সার্স, মার্সের ক্ষেত্রে ইমিউনিটি স্থায়ী হইয়াছিল। এখন দেখিতে হইবে, কোভিড-১৯-এর ইমিউনিটি স্থায়ী এবং সক্রিয় থাকিতেছে, নাকি ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। করোনা লইয়া বিশ্বের তাবড় তাবড় নেতা হিমশিম খাইতেছেন। করোনা-বিপর্যয় যাহাতে আমরা ভালোভাবে সামলাইতে পারি, তাহার জন্য সকল ধরনের বিকল্প যাচাই করিয়া দেখা প্রয়োজন।