চীনের খুব কাছের দুইটি দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনাম কোভিড-১৯ চিকিত্সায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের এই সাফল্য সারা পৃথিবীর কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। তার অনেকগুলো কারণের একটি হলো করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল তাদের নিজস্ব। দেশ দুইটির কাছে তথ্য ছিল—ভাইরাস পরীক্ষায় চীনের কিট শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। সে কারণে চীনের ওপর নির্ভর না করে তারা নিজেরাই কিট উত্পাদন করে। কিটের কোনো স্বল্পতা না থাকায় তারা গণহারে তাদের নাগরিকদের পরীক্ষা করতে থাকে। ভিয়েতনাম তাদের প্রধান সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে স্থাপন করেছে টেস্টিং বুথ। দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের জনগণকে নির্বিচারে পরীক্ষা করেছে।
৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। শুরু থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং দুনিয়ার তাবত্ বিশেষজ্ঞরা গণহারে টেস্ট করার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। কোভিড-১৯-এর চিকিত্সা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা মত থাকলেও একটা বিষয়ে তারা একমত ছিলেন এবং আছেন— পরীক্ষা, চিহ্নিতকরণ ও বিচ্ছিন্নকরণের মাধ্যমেই এই রোগের মহামারি ঠেকানো সম্ভব; কিন্তু বাংলাদেশ সে কাজটি যথাযথভাবে করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল কিটের স্বল্পতা ও পরীক্ষাগারের অভাব। ফলে গত ৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মোট ২৩ দিনে পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬০২ জনকে। দৈনিক গড়ে ৬৯ দশমিক ৬৫ জন। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত টেস্ট করা হয়েছে ৫০ হাজার ৪০১টি। এখন যখন সারাদেশেই এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে তখন এই কয়েক দিন ধরে টেস্ট করার সংখ্যা ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। যদিও অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে টেস্টের সংখ্যা দৈনিক ১৫/২০ হাজারে উন্নীত করা প্রয়োজন। অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বাংলাদেশের কি এতসংখ্যকের পরীক্ষার সামর্থ্য আছে?
অবশ্যই আছে। একটা প্রশ্ন আমার মধ্যেও রয়েছে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মার্চ মাস জুড়ে তারা কেন দৈনিক ৫০/৬০টার বেশি টেস্ট করলেন না? কেন? পৃথিবীতে যত টেস্ট হচ্ছে এর মধ্যে পিসিআর টেস্ট হচ্ছে করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে নির্ভুল টেস্ট। বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে ১৫টি পিসিআর ল্যাব আছে, যাদের দৈনিক ২৫/৩০ হাজার টেস্ট করার সক্ষমতা রয়েছে। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে পারত। তাদের হাতে দায়িত্ব দিতে না চাইলেও অসুবিধা কিছু ছিল না। সরকার সারাদেশ থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে শুধু পরীক্ষার জন্য তাদের দিতে পারত। এখন তো সরকার সারাদেশ থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করছে। এ ক্ষেত্রেও তা করতে পারত; কিন্তু কেন করছে না তার কোনো জবাব নেই। গত ২৫ এপ্রিল করোনা ভাইরাস শনাক্তে রোগী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষার জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত টেস্টিং কিট ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট’-এর নমুনা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সরকারের প্রতিনিধিরা যাননি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বা আইইডিসিআর বলছে, আমরা কেন ওখানে যাব? ওটার তো কোনো অনুমোদন নেই। ঔষধ প্রশাসন বলছে, গণস্বাস্থ্যকে এমন অনুষ্ঠান করতে মানা করেছিল তারা। কিট উদ্ভাবনের স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করে নিবন্ধন আবেদন করতে বলেছিল ঔষধ প্রশাসন। এগুলো তো একটি আইনি প্রক্রিয়া তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে; কিন্তু ঐ অনুষ্ঠানে গেলে সরকারের আন্তরিকতা কি প্রকাশ পেত না? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ড. বিজন কুমার শীল ছিলেন দলের নেতা। এই দলে ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিবিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বিবদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নিহাদ আদনান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. রাশেদ জমিরউদ্দীন এবং আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহসানুল হক। গবেষণা কাজের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ মহিবুল্লাহ খন্দকার। ড. বিজন কুমার শীল ও তার দল র্যাপিড টেস্টিং কিট কীভাবে কাজ করবে তা হাতেকলমে দেখান। চাকতির মতো ছোটো একটি ডিভাইসে রক্তের কয়েক ফোঁটা দিলে যদি ডিভাইসে দুইটি দাগ ভেসে ওঠে তাহলে করোনা ভাইরাস পজিটিভ বলে ধরে নিতে হবে। যদি দাগ একটি ওঠে, তাহলে ধরে নিতে হবে করোনা ভাইরাস নেই। গবেষকরা আরো জানিয়েছেন—এই প্রক্রিয়ায় অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি দুইটি পরীক্ষা করাই সম্ভব হবে। অর্থাত্ ভাইরাস শরীরে থাকা অবস্থায় যেমন শনাক্ত করা যাবে, তেমনি ছেড়ে যাওয়ার পরও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না—তা বোঝা যাবে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের দাবি, ‘বিশ্বে করোনা টেস্টের কিট আরো আছে; কিন্তু আমাদেরটা তাদের চেয়ে আলাদা, ইউনিক। আমাদের এই কিটের বৈশিষ্ট্য হলো—এটা কোনো পজিটিভ কেসকে বাদ দেবে না। এটাই মূল সাফল্য। কারণ, টেস্টে পজিটিভ কেস বাদ পড়লে করোনা ছড়িয়ে পড়ে। আর অন্যান্য র্যাপিড কিটে ব্লাড দিয়ে করে। আমাদেরটা হলো ডট ব্লট। রক্তের সিরাম থেকে করা হয়। খুবই সেনসিটিভ এবং ১৫ মিনিটে ফল পাওয়া যাবে।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি মেডিসিনে মাস্টার্স করা বিজন কুমার ডক্টরেট করেছেন ইংল্যান্ডের সারে ইউনিভার্সিটি থেকে, ১৯৯১ সালে। সেখানে ১০ বছর কাজ করেন। ২০০২ সাল থেকে তিনি সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সিতে কাজ শুরু করেন। সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি ভাইরোলজি বিভাগে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। সার্স ভাইরাস টেস্টের কিট বানানোর কাঁচামাল থেকেই করোনা ভাইরাস টেস্টের কিট তৈরি করেছেন বাংলাদেশের এই গবেষক। সার্স ভাইরাস পরীক্ষার কিটের প্যাটেন্ট ড. বিজন কুমারের নিজের। ২০০৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সিতে চাকরি করার সময় এই কিট আবিষ্কার করেন।
তাছাড়া, ঔষধ প্রশাসন যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছে সেগুলো কেউ অস্বীকার করছে না। নিয়মের কাজ নিয়মে হবে; কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কিছু দায়িত্ব থাকে। এই যে এত বড়ো একটি আবিষ্কার, তাকে উত্সাহ দেওয়া এবং তাকে এগিয়ে নেওয়া কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? গবেষক দলের উদ্ভাবিত কিট নিয়ে যদি বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকে তবু তো তাদের এই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, ডিজিসহ সবাই অন্তত উপস্থিত থাকলে আমাদের বিজ্ঞানীরা উত্সাহ পেতেন। এরপর না হয় কিট ব্যবহারের আগে বিভিন্ন পক্ষকে দিয়ে যত খুশি পরীক্ষা করানো যেত। কিন্তু যা করা হলো তা শুধু বিতর্কের জন্ম দেবে। এবং মানুষ সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখবে। যুক্তরাজ্য ভ্যাকসিনের গবেষণার জন্য এই তো সেদিন একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ২৫ লাখ পাউন্ড সহায়তা দিয়েছে। এই যে উত্সাহ এটি হলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
গণস্বাস্থ্যের এই কিট যদি সফল হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য সেটা যে কত বড়ো সুযোগ হবে সরকার কি তা একবার ভেবেও দেখবে না? বাংলাদেশে যদি এখন দৈনিক ১৫/২০ হাজার টেস্ট করতে পারত তাহলে এই ভাইরাসের সংক্রমণকে টেনে ধরতে পারত। মাত্র ৩০০ টাকায় এবং ১৫ মিনিটে পরীক্ষা, চিন্তা করা যায়?
n লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
