বিশ্বব্যাপী মানবিক বিপর্যয়ে সব দেশই পারস্পরিক ও দ্বৈত সহযোগিতা জোরদার করে। কখনো কখনো ভূরাজনৈতিক বিরোধীরাও একে অপরকে সহায়তা করে। ২০০৩ ও ২০১২ সালে ইরানে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পরে আমেরিকাও সাহায্য করেছিল। তবে করোনা ভাইরাস মহামারি চলাকালীন দুই জন অতিশয় শক্তিশালী রাশিয়া এবং চীন ভূরাজনৈতিক লাভের জন্য তাদের বাহ্যিক সহায়তা ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক কার্যকলাপে সেসব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কন্টির মধ্যে সাম্প্রতিক এক ফোনালাপের পরে রাশিয়ার সরকার ৯টি বিমানে চিকিত্সা সরাঞ্জামসহ ইতালিতে শতাধিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে। ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটের চতুর্থ বৃহত্তম অনুদানকারী হয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো থেকে প্রথমদিকে কোনো সহায়তা না পেয়ে হতাশ হয়ে রাশিয়ার কাছে ঘেঁষেছে।
জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়া লক্ষ লক্ষ ফেস মাস্ক ইতালিতে পাঠিয়েছে, চেক প্রজাতন্ত্র কয়েক হাজার ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সুট পাঠিয়েছে। জার্মানি বেশ কয়েক ডজন ইতালি এবং ফরাসি রোগীকে জার্মান হাসপাতালে বহন করেছে। পোল্যান্ড ১২ জন চিকিত্সক প্রেরণ করেছে। তবে বহুল প্রত্যাশিত রাশিয়ান সহায়তা হাতে পাওয়ার পরে ইতালীয়রা আবিষ্কার করল যে সরবরাহের সিংহভাগই করোনা ভাইরাস চিকিত্সার জন্য অকেজো। এটি দখলদারিত্বের একটি চক্রান্তের মতো ছিল। নরওয়েজিয়ান টেলিভিশন সিরিজ এভাবেই বর্ণনা করেছে। ক্রেমলিনের সহায়তা আসলে অস্বাভাবিক। ইতালির শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা লা স্ট্যাম্পা জানিয়েছে, চিকিত্সক বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাঠিয়েছিলেন। এরচেয়ে বড়ো কথা, অনেকেই রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর মেডিকেল শাখায় সিনিয়র জৈবিক, রাসায়নিক এবং পারমাণবিক কর্মকর্তা।
ইতিমধ্যে চীনও চিকিত্সা সরঞ্জাম এবং কয়েক জন মেডিক্যাল স্টাফ পাঠিয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি দি মাইও ঘোষণা করেছিলেন যে, ৪২টি ভেন্টিলেটরসহ ৩১ টন সরঞ্জাম প্রাথমিকভাবে পাঠানোর পর ২৫ মার্চ ৩০টি ভেন্টিলেটরসহ আরো কিছু সরঞ্জাম পেয়েছেন। তবে ইতালিতে যেখানে দেড় লক্ষের বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে সেখানে চীনের এই সহায়তা ছিল এক বালতি পানির মধ্যে একবিন্দু জ্বলের মতো। চীন ইতালির সত্যিকারের বন্ধু হলে তারা কয়েক হাজার ভেন্টিলেটর পাঠাত। চীনা সরবরাহগুলো হুবহু দাতব্য উপহার ছিল না। কেউ কেউ চাইনিজ রেডক্রস থেকে এসেছিল, বাকি সব অর্থের বিনিময়ে কিনতে হয়েছে। প্রথম বিমানটি পৌঁছানোর প্রায় একই সময়ে, চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো গুজব প্রচার শুরু করে যে কোভিড-১৯-এর প্রকোপটি প্রকৃতপক্ষে ইতালিতে শুরু হয়েছিল। চীন অন্যান্য দেশেও সহায়তা পাঠিয়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ফেসমাস্ক উত্পাদনের ৫০ শতাংশ ছিল চীনের এবং যার দৈনিক ফেসমাস্ক উত্পাদন ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছায় ১১০ মিলিয়নে। এমন একটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কয়েক জন ডাক্তার আর সামান্য চিকিত্সা সরঞ্জাম খুব বেশি কিছু নয়। ৩ মিলিয়নেরও কম বাসিন্দা নিয়ে একটি দরিদ্র দেশ আলবেনিয়া ইতালিয়ানদের ৩০ জন চিকিত্সক এবং নার্স পাঠিয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ সাহায্য এসেছে তা ছিল যত্সামান্য। বেইজিং এই সরবরাহগুলো পাবলিসিটির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রচণ্ড ধুমধামের সঙ্গে মুখের মাস্কগুলো স্পেন, ফ্রান্স, সার্বিয়া এবং ইইউতে পাঠানোর মাধ্যমে চীনের সফট পাওয়ার প্রকাশ্যেই প্রদর্শন করা হয়েছে। ২০ মার্চ, চেক প্রজাতন্ত্র একটি চীনা সামরিক বিমানে এসব সরঞ্জাম পেয়েছে, যেটি সরকারবান্ধব মিডিয়াগুলোর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
পণ্য বিক্রি এবং সহায়তা করা ঐসব দেশগুলোকে ইইউ ও ন্যাটো সংহতি থেকে দূরে রাখার এই দুটি লক্ষ্য চীনের মধ্যে স্পষ্ট। রাশিয়ার প্রচেষ্টা মারাত্মক ধোঁয়াশা প্রকৃতির। ইতালির বার্গামোতে রাশিয়ার উপস্থিতির প্রকৃত প্রকৃতি যেমনই হোক না কেন, জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবার নামে রাশিয়ার সামরিক স্টাফদের পাঠানো স্পষ্টত নিঃস্বার্থ আচরণ নয়। এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যা দীর্ঘ সময় ন্যাটোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ‘প্রয়োজনের মুহূর্তে, যে ব্যক্তি আপনাকে সহায়তা করে সে একজন বন্ধু’, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপসচিব ম্যানলিও ডি স্টেফানো ২৭ মার্চ ইতালির এক রেডিওকে রাশিয়ান এবং চীনা সহায়তাকে ‘বোকামি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বাইবেলের উত্তম সমরিয়ান অচেনা লোকদেরকে সহায়তার বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করে না। চীন ও রাশিয়া মানবিক সহায়তার একটি নতুন ক্যাটাগরি চালু করেছে। চাইনিজ এবং রাশিয়ানরা হয়তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তারা এর বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

