আলোকপাত

করোনা, লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ২২:০৮

আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, তারা চাকরিবিধি পড়ার সময়ই কোয়ারেন্টাইন সম্পর্কে পড়েছি। কখনো এ অবস্থার বাস্তব সম্মুখীন হতে হবে তা ভাবিনি। লকডাউন সম্পর্কে আমরা আগে এতটা অভিহিত ছিলাম না। করোনা (কোভিড-১৯)-এর অশুভ সূচনার সঙ্গে সঙ্গে এসবের সঙ্গে এতটাই পরিচিত হতে হচ্ছে যে জীবন বিষিয়ে উঠছে। মনে হয় না এখন আর লকডাউনের সংজ্ঞা প্রদানের প্রয়োজন হবে। দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাওয়া গেল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আশীর্বাদের জন্য।

২০০৬-০৮ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্সে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নের সময়ে ভার্চুয়াল পৃথিবীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আর আমার এই প্রধান আকর্ষণই ছিল আমার এতদিনের অধ্যয়নের বিষয় রসায়ন থেকে সাবজেক্ট মাইগ্রেশনের কারণ। একটা সময় ভাবতাম, আমাকে যদি কোনো কারণে একা একটা দ্বীপে বসবাস করতে বলা হয় আর ইন্টারনেট দেওয়া হয়, তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না কিংবা বোরিং লাগবে না। সাইবার পৃথিবী বিচরণের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বলছিলাম এটাই, সরকার এত চেষ্টা করছে লকডাউন কার্যকর করতে কিন্তু আমরা নাগরিক সমাজ পারছি না কিংবা মানছি না। অজুহাত দিয়ে বলছি সময় কাটছে না। বলছিলাম, এক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি একটা আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। কেননা আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, তারা সরকারের কাজকর্ম ইন্টারনেট বা ফোনের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছি ও নিচ্ছি। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে একটা গদ; তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। যেমন—ইউনিয়ন পর্যন্ত ফাইবার অপটিকের মাধ্যমে দ্রুত গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট, উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা, বিভাগ, কিংবা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কানেক্টিভিটির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তথ্য সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও শেয়ারিংয়ের দুই পেটাবাইট বা ২০ লাখ গিগাবাইটের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ফোর টায়ার ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার। মোবাইল ফোন উচ্চগতির ইন্টারনেটের আওতায় আনা হয়েছে। ২৫ হাজার ওয়েবসাইটসম্পন্ন জাতীয় তথ্য বাতায়ন, যেখানে সব কর্মকর্তা কর্মচারীকে ফোন/মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। ই-ফাইলের মাধ্যমে ফাইল নিষ্পত্তি, ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যে কেউ যে কোনো জায়গা থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়েও নাগরিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। ব্যাংকিং সেবা ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে জনগণ ঘরে বসে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছে।

নাগরিকদের এই চলাচল সীমিত বা সামাজিক দূরত্বের মধ্যেও কাছে রাখতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। হোয়াটসআপ, ভাইবার, ইমু কিংবা ফেসবুক কিংবা ভার্চুয়াল ক্লাসের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি উদ্যোগেও টেলিভিশনের মাধ্যমে ঘরে বসে ক্লাসের সুযোগ পাচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে আয় করা লকডাউনে বন্ধ হয়ে যায়নি। কিংবা বাসায় থেকে দেশি বা বিদেশি সংস্থা থেকে কোনো প্রফেশনাল সার্টিফিকেশন কোর্সের সুযোগটাও নেওয়া যেতে পারে, যেমন—মাইক্রোসফট প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, অফিস বা অন্যান্য মাইক্রোসফট সার্টিফিকেশন কোর্স। সিসকো (Cisco) থেকে নেটওয়ার্কিং বা প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত কোর্স করা যায়, যা পরবর্তী সময়ে রিমোট (দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত) দেশে-বিদেশে কাজ করা যাবে। ইউটিউব থেকে শিখে নেওয়া যেতে পারে পছন্দের রান্নাটাও। এক কথায়, লকড ডাউন বা কোয়ারেন্টাইনে ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতায় তথ্য প্রযুক্তির এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে দেশের উন্নয়নে অংশীদারের প্রয়াস হোক করোনার এ বিশ্বমহামারিতে।

n লেখক :উপসচিব, উপপ্রকল্প পরিচালক, রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মিরপুর-২