কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ, শ্রমিক অসন্তোষ পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল একটি সিদ্ধান্তে এসেছে সরকার। চলতি এপ্রিল মাসে বন্ধ থাকা বা কাজ না হওয়া গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা মোট বেতনের ৬০ শতাংশ অর্থ পাবে। আর চালু থাকা কারখানার শ্রমিক পাবে বেতনের পুরো অংশ। এছাড়া আগামী মে মাসে কোনো কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই বা কারখানা লে-অফ (সাময়িক বন্ধ) করতে পারবে না| টানা দুই দিন কারখানা মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা শেষে গতকাল এ সিদ্ধান্তের কথা জানান শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। ইস্যুটি নিয়ে মঙ্গলবার মালিক পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর এমন সিদ্ধান্তের আভাস পাওয়া যায়। গতকাল বুধবার শ্রমিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
গতকাল সচিবালয়ে সভা শেষে শ্রম প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় শিল্পাঞ্চলের বাইরে থাকা শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলমুখী না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মোবাইল ব্যাংকিং হিসেবে প্রাপ্য বেতনের টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে। যদিও ঢাকামুখী শ্রমিকদের শ্রোত কার্যত ঠেকানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে মন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। জানা গেছে, গতকালের সভায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর বড়ো অংশই উপস্থিত ছিল না। অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) আমন্ত্রণ না পাওয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনগুলো সভায় উপস্থিত হয়নি। এদেরই একটি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন। সংগঠনের সভাপতি কল্পনা আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, এ সিদ্ধান্ত শ্রমিকের পেটে লাথি মারার সামিল। শ্রমিকের বাসাভাড়া কি মাফ করা হয়েছে? তাদের কোনো খরচ কি কমেছে? তাহলে তারা চলবে কীভাবে?
সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি। সভা শেষে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত মন্দের ভালো। সবারইতো বাঁচতে হবে।
অন্যদিকে মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা আগের দিনই এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে এসেছেন।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এই সভার কার্যবিবরণীসহ আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করব। বাংলাদেশ ব্যাংক তপশিলি ব্যাংকগুলোকে সে অনুযায়ী নির্দেশনা দেবে। এর ভিত্তিতে ব্যাংক সরকার গঠিত ৫০০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে বেতন পাঠাবে। গ্রামে ফেরা শ্রমিকদের কর্মস্থলে না ফিরতে গতকালও আহ্বান জানিয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বলেছে, যেসব শ্রমিক ঢাকার বাইরে রয়েছেন, তাদের এপ্রিল মাসের বেতন মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে (নগদ, বিকাশ, রকেট ইত্যাদি) মাধ্যমে পাঠানো হবে। কাজে না ফিরলে কোনো শ্রমিক চাকরি হারাবেন না বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধের জন্য সরকার ঋণ হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে পোশাক খাত প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাবে। মালিকরা বলছেন, পোশাক খাতে প্রতি মাসে বেতন বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ কর্মকর্তাদের, ৬০ শতাংশ শ্রমিকদের পেছনে ব্যয় হয়। তাতে পোশাক খাতের শ্রমিকদের মাসিক মজুরির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এপ্রিল মাসে ৬০ ভাগ বেতন দেওয়ায় এ খাতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। এদিকে সরকারের প্রণোদনা ঘোষণার পরই কারখানাগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি ঢালাও লে-অফ শুরু হয়। এ নিয়ে অসন্তোষও বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনা জারি করে জানিয়ে দেয়, লে-অফ হওয়া কারখানা প্রণোদনার সুবিধা পাবে না। এরপর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় মালিক পক্ষের।
