লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবার গুলো। এসব কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে উপজেলা প্রশাসন এবং বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছেন।
উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার এই কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার পরিবার সরকারি ও বেসরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন। এদের মধ্যে উপজেলার চর গাজী ইউনিয়নের চর লক্ষ্মী গ্রামের রিক্সা চালক সাহাদাত হেসেন। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে লোকজন এখন আর রিক্সাতে উঠতে চায় না। এতে করে দৈনিক কোন আয় বলতে নেই। কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে ঘরে খাবার ছিল না। করোনা ভাইরাস দুর্যোগের এই সময়ে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন থেকে তিনি ১০-১২ দিনের খাদ্য পেয়ে তার চোখে মুখে আনন্দের হাসি।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বললে অনেকেই বলেছেন, এসব সহায়তা পেয়ে তারা খুব খুশি।
সোমবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের দুর্যোগের এই সময়ে কর্মহীন অনেক পরিবারই কম বেশী সহায়তা পাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলগ্রামের বিধবা বিবি মনোয়ারা (৫০)। চর সেবাজ এলাকা মেঘনা নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়ে তিনি এখন অন্যের জায়গায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে কয়েক বছর আগে, মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া আমার ছেলেটাকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় ছিলাম। ঠিকমত খাবার পেতাম না। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকারি এবং একটি সংগঠনের সহযোগিতা পেয়েছি। এতে আমরা ১০-১৫ দিন চলতে পারবো।’
এ ছাড়া কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের মধ্যে উপজেলার বালুরচর এলাকার আবদুস সহিদ, রামগতি পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের বেলালসহ কয়েকজন জানান, সরকারি ভাবে তারা খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে। তাদের মত অনেকেই গত কয়েক দিনের ব্যবধানে এমপি, ইউএনও, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানান। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি এসে খাদ্য দিয়েছেন, এমন সাহায্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। তবে সামনের দিন কি ভাবে কাটবে এ বিষয়ে হতাশার কথাও জানিয়েছেন অনেকেই।
উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবদুল মোমিন সরকারি ভাবে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র ৭ হাজার পরিবারকে। এ ছাড়া যে সব রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন, তারা হলেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব:) আবদুল মান্নানের উদ্যোগে ৫শ পরিবার, সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্যাহ আল মামুনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিন হাজার পরিবার, কেন্দ্রীয় বিএনপি’র শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহ-সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের উদ্যোগে নগদ ৫শ’ টাকা করে এক হাজার ৬শ পরিবার, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুর উদ্যোগে ৬শ’ পরিবার, ঢাকা উত্তর আওয়ামী যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তাসভীরুল হক অনুর উদ্যোগে ৩ হাজার পরিবার, উপজেলা ও পৌর যুবলীগের উদ্যোগে এক হাজার ৫ম’ পরিবার, সামাজিক সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’ এর উদ্যোগে এক হাজার ৩শ’ ৫০ পরিবার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রামগতি-কমলনগর অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের উদ্যোগে ২শ’ ৪০ পরিবার, রামগতি স্টুডেন্ট কমিউনিটি ঢাকা এর উদ্যোগে একশ’ পরিবার, ঢাকা ইউনিভারসিটি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অব রামগতি’র (ডিইউএসএআর) উদ্যোগে ২৫ পরিবার। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে প্রায় এক হাজার পরিবারসহ এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার পরিবার খাদ্য সহায়তা পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে যায়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রিয়াদ হোসেন জানান, উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮ ইউনিয়নে সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ৭ হাজার পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, লবন, পিয়াজ, আলু ও সাবান। তিনি আরও জানান, উপজেলার পৌরসভা ও সব কয়টি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২০ হাজার কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে। এ কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের মধ্যে রয়েছে দিন মুজুর, ভ্যান চালক, রিক্সা চালক, ক্ষুদ্র দোকানদার, ভিক্ষুক। এসব পরিবারকে আগামী মে ও জুন মাসে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।
এছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নে নিয়োগ করা ডিলারদের মাধ্যমে হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজি দরের চাল দেওয়া হয়েছে হচ্ছে বলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা যায়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল মোমিন জানান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এলাকায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গে সমন্বয় করে দরিদ্র পরিবারের তালিকা তৈরী করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার খাদ্য সামগ্রী সুষ্ঠু ভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, খাদ্য সহায়তা পাওয়ার জন্য হটলাইন নাম্বার চালু করা হয়েছে। হটলাইন নাম্বারের মোবাইল ফোনে এসএমএস এর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সহায়তা পৌছে দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া পৌরসভা ও সব কয়টি ইউনিয়ন থেকে আরও কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে। এসব পরিবারগুলোকে পরবর্তীতে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। এলাকার কর্মহীন ও অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলো যাতে সঠিক ভাবে খাদ্য সহায়তা পান প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিংও করা হচ্ছে।
ইত্তেফাক/এমআরএম
