আনুশে হোসেন
করোনা ভাইরাস মহামারি সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভূমিকা এখন সারা বিশ্ব জানে। আর সেই ভূমিকাকে কিনা একটি ‘দুর্দান্ত সাফল্যের গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জারেড কুশনার! এটাকে কী বলা যায়! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট সন-ইন-ল জারেড কুশনার যেমন একটি বুলশিট ব্র্যান্ড, নিজের মতো একই রকম তিনি মনে করছেন মার্কিন প্রশাসনকেও।
গত বুধবার ফক্স নিউজে উপস্থিত হয়ে কুশনার দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা কোভিড-১৯-এর চিকিত্সার বিশেষ দিকে নজর দিয়েছি এবং আমি মনে করি এ ব্যাপারে আমরা ভিন্নতর কিছু সাফল্যের মাইলফলক স্পর্শ করে ফেলেছি।’
লেটনাইট টিভি হোস্ট জিমি কিমেল তার একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি রসিকতা করে বলেছেন, “জারেড কুশনার নিজের ভেতরে এতটাই অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ‘মেলানিয়া’ বলে ডাকেন! শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যদি কাঁচা কুকির ময়দা মাখা বাচ্চা থাকে, জারেড কুশনারকে ঠিক তেমনটি দেখাচ্ছে। জারেড কুশনারকে ইয়ং শেল্ডনের একজন চকলেট বিতরণকারীর মতো দেখাচ্ছে। এই জারেড আমাকে আশাহীন করে! যে আইডিয়াকে জারেড দুর্দান্ত বলে মনে করছেন, সেটাকে একজন বিকারগ্রস্ত মানুষই কেবল ‘দারুণ’ বলে মনে করবে। জারেড তেমনই এক কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ।” যদিও কুশনারের টাকাপয়সার ব্যাপারে কিমেল তেমন কিছু বলেননি, তবে ইভাঙ্কার স্বামীর নিজের সর্বশেষ বিশেষ এলাকাটি আসলে রঙিন এক জগত্।
পাঠক দেখুন, স্টেসি আব্রামসের জন্য মিডিয়া কেমন খুঁতখুঁতে আর সোচ্চার হয়ে ওঠে বাইডেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাছাইয়ের ব্যাপারে। আব্রামসের যোগ্যতা নিয়ে সিএনএনের জ্যাক টেপারের কেবল অসংখ্য প্রশ্নবিদ্ধ নিবন্ধই নেই, একই সঙ্গে তাকে এমন জিজ্ঞাসাও করা হয়েছে যে তিনি কেন তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ভোঁতা! টেপারকে আব্রামস বলেছিলেন, ‘আমাকে গত বছর থেকেই এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমাকে ন্যাশনাল কনভারসেশনে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং আমার কাজের ব্যাপারে আমি নিজেকে একনিষ্ঠ এবং অত্যন্ত সত্ বলে মনে করি। মিসিসিপিতে বেড়ে ওঠা এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী হিসেবে আমি শিখেছি যে আপনি যদি হাত না বাড়ান, লোকেরা আপনাকে দেখতে পাবে না এবং তারা আপনার সমস্যার ব্যাপারে কোনো মনোযোগও দেবে না।’ এবং সেখানেই তিনি থামেননি। আব্রামস দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, তিনি কেবল বাইডেনের রানিং মেট হওয়ার জন্যই মনোযোগ চাইছিলেন না, একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে তার যোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই। তার যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ নয়।
করোনা ভাইরাস নরকের মাঝে কুশনারের বেপরোয়া মন্তব্যগুলো আমাকে ভীষণভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে যে স্টেসি আব্রামস, এমনকি কমলা হ্যারিসের মতো অত্যন্ত যোগ্য ও ব্রিলিয়ান্ট মেয়েদের প্রতি উন্নাসিকতা দেখানো হচ্ছে কেবল তাদের গায়ের রঙের জন্য।
আমরা স্টেসি আব্রামসের কী জন্য ‘আমিন’ (তার ইচ্ছা পূরণ হোক) বলতে পারি? কেবল তার অত্যন্ত খাঁটি ও যথার্থ জবাব দেওয়ার ক্ষমতার জন্য নয়, তিনি টেপার এবং বাকি দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আসলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য যোগ্য। এবং এই যোগ্যতা তিনি এমন একটি পৃথিবীতে অর্জন করেছেন, যেখানে প্রতিমুহূর্তে তাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর কারণ কিনা তার গায়ের রং! আমরা স্টেসি আব্রামসের মতো চৌকস নারীকে জিজ্ঞাসা করতে দ্বিধা করি না, কেন সে তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে! অথচ আমরা কুশনারের বোধবুদ্ধির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারি না—কোন আক্কেলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে জুলাইয়ের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে?
যেমনটি হচ্ছে, নারীর শরীরের রং নিয়ে কেউ কেউ সামঞ্জস্যহীনভাবে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমে ভুগছেন, অন্যদিকে কোভিড-১৯-এ আমেরিকায় ইতিমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাওয়ার পর কুশনারের বিভ্রান্তিমূলক আত্মবিশ্বাস অটুট রয়েই গেছে। কেন এমন হচ্ছে? কারণ একজন সাদা মানুষ আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে প্রশাসনের ভূমিকাকে ‘সাফল্যের গল্প’ হিসেবে জনগণকে গেলাতে চাইছেন এবং কোভিড-১৯ থেকে মনোযোগ দূরে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করছেন।
যদিও এটি বেশ বিস্ময়কর যে জারেড মনে করছেন—তিনি যা বলছেন, সেটাই আসলে বলা দরকার! তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতা ভিন্ন হতে শুরু করছে। কুশনারও তার শ্বশুর ট্রাম্পের মতোই সত্য ও প্রকৃত ঘটনা থেকে নিজেদের আলাদা করার ব্যাপারে কুখ্যাত। আমান্ডা মার্কোটি তার একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে শেষাংশে বলেছেন যে কুশনার নিজের ভাবনাচিন্তায় ভয়াবহভাবে অবিচল। কুশনার বারংবার মার্কিন ফেডারেল কর্মকর্তাদের বলেছেন যে করোনা ভাইরাসকে খুব বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। মার্কোট কুশনারকে বর্ণনা করেছেন এভাবে :
“যুক্তরাষ্ট্রে ১ মিলিয়ন নিশ্চিত করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে এবং এই সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি। ইতিমধ্যে ৩ কোটি আমেরিকানের মাথার ওপর বেকারত্বের খড়্গ ঝুলছে। এসব গুরুতর বিষয়কে পাশ কাটিয়ে মার্কিন প্রশাসন কুশনারের পক্ষে কোভিড-১৯ মোকাবিলার যে ‘সাফল্যের কাহিনি’ বলছেন, তা বুলশিট। এবং এটার আরো একটি তাত্পর্যপূর্ণ দিক হলো, আমরা আসলে কুশনারের ভয়াবহ নির্বোধ ‘আত্মবিশ্বাস’কে উপেক্ষা করতে পারি না। এটা উপেক্ষা করলে সেটা হবে ভীষণ বিপজ্জনক এবং এই ক্ষতি সহ্য করার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
‘হয়তো একজন মধ্যমানের সাদা মানুষের ওপর আপনার আস্থা আছে’—এ ব্যাপারে আপনার মনে যদি কখনো কোনো সন্দেহ না থাকে, তবে জারেড কুশনার আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সত্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই!
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : অদ্বয় দত্ত
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
