করোনায় আফ্রিকাতে মারা যাবে ৩০ লাখ মানুষ!

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ২১:১০

শিফারুল শেখ

 

সম্প্রতি বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কেনিয়ায় এক মা তার সন্তানদের খাবার দিতে না পেরে হাঁড়িতে পানি ও পাথর জ্বালাচ্ছিলেন। মা খাবারের কথা বলে তাদের ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সন্তানদের ক্ষুধার কান্না কিছুতেই থামছিল না। এক প্রতিবেশী বাচ্চাদের কান্নার বিষয়টি জানতে গেলে মায়ের পানি ও পাথর রান্না করার দৃশ্য দেখতে পান। তিনি বিষয়টি মিডিয়ায় জানান এবং খবর প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক সহায়তা আসে। করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগে আফ্রিকা মহাদেশের এই দেশটির একটি পরিবারের দৃশ্য এটা। এরকম কত পরিবার আফ্রিকায় আছে তা অজানা। তাদের ভাইরাসের ভয় যেমন আছে তেমনি ক্ষুধায় মারা যাওয়া বা আরো দরিদ্র হওয়ার ভয়ও আছে। কারণ বিশ্বের দরিদ্রের এক-চতুর্থাংশই আফ্রিকা মহাদেশে বাস করে।

৩০ লাখ মানুষ মরবে! : লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ মার্চ মাসে এক গবেষণাপত্রে দাবি করে, আফ্রিকায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। জার্মানির মিডিয়া ডয়চে ভেলের টম উইলস বলছেন, তারা কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। যদিও এটা সম্পূর্ণ হাইপোথেটিক্যাল গবেষণা। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নিলে এমন আশঙ্কা সত্যি নাও হতে পারে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নাইজেরিয়ায় ৩ লাখ ৯২ হাজার, ইথিওপিয়ায় ২ লাখ ৬৫ হাজার, দক্ষিণ আফ্রিকা ১ লাখ ৯৮ হাজার, তানজানিয়ায় ১ লাখ ১২ হাজার, সুদান ১ লাখ ৬ হাজার, কেনিয়া ১ লাখ, ঘানা ৭০ হাজার, উগান্ডা ৬৮ হাজার এবং লাইবেরিয়ায় ১১ হাজার ও বাকিগুলো অন্যান্য দেশে মারা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আফ্রিকায় কোভিড-১৯ রোগে ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঐ মহাদেশে ১ কোটি মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। ১ মে পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশের মধ্যে লেসোথা বাদে বাকি ৫৩টিতেই ছড়িয়েছে ভাইরাস। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার আক্রান্ত এবং মৃত্যু প্রায় ২ হাজার।

আতঙ্ক যে কারণে : আফ্রিকা জুড়ে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যায় বড়ো ধরনের উল্লম্ফন দেখার পর সেখানকার প্রায় ১২০ কোটি মানুষের ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। আফ্রিকার মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত; শহুরে অধিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বিভিন্ন বস্তিতে গাদাগাদি করে থাকে। এসব কারণে করোনা ভাইরাস আফ্রিকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে অনুমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। তাদের মতে, আফ্রিকায় করোনার বিস্তার শুরু হলে সেটা ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের থেকেও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হবে। সেখানে ১০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র পাঁচটি আইসিইউ যেখানে ইউরোপে ১০ লাখে রয়েছে  ৪ হাজারটি। ভেন্টিলেটর কম থাকাই সেখানে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে ভাইরাস মোকাবিলায়। এই ভাইরাস ৩ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে।

করোনা মহামারি শুরুর অনেক আগে থেকেই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবসৃষ্ট সংকটে বিশ্বের প্রায় ১২ কোটি মানুষ খাবারের অভাবে ভুগছেন। এরমধ্যে অন্যতম দুর্গত এলাকা হচ্ছে ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও সোমালিয়া। জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার হিসেবে, এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, একের পর এক ফসলহানি, পাশাপাশি এর চেয়েও বড়ো বিপদ মরু পঙ্গপালের হানায় খাদ্যশস্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে এই তিন দেশের অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বছরের শুরু থেকেই খাদ্য সংকটে। আবার এই মহাদেশকে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি এবং অপুষ্টি তো লেগেই আছে। নতুন করে করোনা ভাইরাস বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়লে তা থেকে বিশ্ব মুক্ত থাকতে পারবে না বলে বলছে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন।

আশা যেখানে : আফ্রিকার ৭০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। বয়স্ক মানুষ কম হওয়ায় মৃতের সংখ্যাও কম হলে মহাদেশের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ধারণা। আবার মহাদেশের অনেক দেশই করোনার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও সুনাম কুড়িয়েছে। দেশটি লকডাউন এরই মধ্যে শিথিল করেছে। একই পদক্ষেপ নিয়েছে রুয়ান্ডাও। এই মহাদেশে এমন অনেক দুর্গম এলাকা আছে যেখানে যাওয়া খুবই কঠিন। সেখানে ভাইরাস খুব বেশি হানা দেবে না বলে মনে করা হচ্ছে। আর ভেন্টিলেটর তৈরির জন্য এরই মধ্যে সফলতাও এসেছে কিছু দেশে। পরীক্ষার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে।