এক মাসে ২০ সংঘর্ষ, নিহত ৭ ও আহত ৫ শতাধিক

আপডেট : ০৪ মে ২০২০, ১৩:০২

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনা পরিস্থিতিতেই গত এক মাসে কমপক্ষে ২০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে শিশুসহ ৭জন নিহত ও ৫শতাধিক লোক আহত হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কয়েকটি বাড়ি-ঘর ভাংচুর ও লুটতরাজ করে প্রতিপক্ষের লোকেরা।

এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জমি নিয়ে বিরোধ, বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধ, রাস্তা নিয়ে বিরোধ, পুকুরে মাছ ধরা, ধানের উপর দিয়ে ট্রাক্টর যাওয়া, এক বাড়ির হাঁস আরেক বাড়িতে যাওয়া, কথা কাটাকাটিসহ বিভিন্ন ছোটখাট ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সব সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিপেটার পাশাপাশি টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে।

সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হন। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ সংঘর্ষে জড়িত থাকার দায়ে এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অর্ধশতাধিক লোককে গ্রেপ্তার করেছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবরোধে সরকারি ছুটি ঘোষণার পর গত ২৬ মার্চ থেকে গত ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কমপক্ষে ২০টিরও বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। করোনা পরিস্থিতিতে গত ১১ এপ্রিল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে লকডাউন করা হয়।

নিহতরা হলেন- আশুগঞ্জ উপজেলার চর-চারতলা ইউনিয়নের মোঃ ইলু মিয়ার ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (৫১), নাসিরনগর উপজেলার কদমতলী গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে ও উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার মোস্তফা কামাল ওরফে মস্তু মিয়া (৬০), কসবায় উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের মোঃ সলিমুল্লাহর ছেলে মোঃ তানভীর (২২), নবীনগর উপজেলার থানাকান্দি গ্রামের মোঃ মোবারক মিয়া (৩৭), কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামের মন মিয়া চৌধুরীর ছেলে ও দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার কসবা উপজেলা প্রতিনিধি মোঃ শাহ আলম চৌধুরীর ছোট ভাই মোঃ ফারুক মিয়া চৌধুরী (৫৩), নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের বড়নগর গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে রজব আলী (২০) এবং বরিশালের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর গ্রামের রাজু মিয়ার আড়াই মাস বয়সী শিশু কন্যা ফারিয়া। প্রবাসী রাজু মিয়ার স্ত্রী নাইমা তার বাবার বাড়ি নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের গোকর্ণ গ্রামে বসবাস করতেন।

২০টি সংঘর্ষের মধ্যে দেশব্যাপী আলোচিত ছিলো গত ১২ এপ্রিল সংঘর্ষের ঘটনা। ওই দিন নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের থানাকান্দি গ্রামে পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু কাউছার মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৫জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমানের সমর্থক মোবারক মিয়া (৩৭) এর পা কেটে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয় প্রতিপক্ষের দাঙ্গাবাজরা। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোবারক মিয়া মারা যান। এ ঘটনায় জিল্লুর রহমান ও কাউছার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সর্বশেষ গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের কাটানিশার গ্রামে মসজিদে যাওয়া নিয়ে গ্রামের মিজান মেম্বার ও ইয়াছিন মুন্সির  লোকদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অর্ধশত লোক আহত হন।

গত ২৬ মার্চ বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২৫জন আহত হন। গত ২৭ মার্চ আশুগঞ্জ উপজেলার চর-চারতলা ইউনিয়নের মুন্সী মার্কেটের পাশে একটি পোড়া গুদামে জুয়ার আসরে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত  হন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম-(৫১)। নিহত জাহাঙ্গীর উপজেলার চর-চারতলা গ্রামের মোঃ ইলু মিয়ার ছেলে।

গত ৩১ মার্চ সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের ভুঁইশ্বর গ্রামে দুদল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক লোক আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২৬ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ১০ রাউন্ড টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। গত ৩ এপ্রিল রাতে নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে খুন হন কদমতলী গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে ও গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার মোস্তফা কামাল ওরফে মস্তু মিয়া (৬০)। ওই দিন সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গ্রামের পশ্চিমদিকে গিয়ে কয়েকজনের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় অতর্কিত হামলার শিকার হন মোস্তফা কামাল।

গত ৪ এপ্রিল সকালে কসবা উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে খুন হন বাহাদুরপুর গ্রামের মোঃ সলিমুল্লাহর ছেলে মোঃ তানভীর-(২২)। পূর্ববিরোধ ও মাটি কাটা নিয়ে ঝগড়ার জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় তানভীর খুন হন।
গত ৫ এপ্রিল একদিনেই সরাইল উপজেলার টিঘর, বড়ইছড়া, বিটঘর, নোয়াগাঁও, ধরন্তী, সৈয়দটুলা (দুইটি ঘটনা) গ্রামে ৭টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বড়ইছড়ায় অর্ধশতাধিকসহ ৭টি ঘটনায় শতাধিক লোক আহত হন।
ওই দিন বিকেলে মার্বেল খেলা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার ভাদুঘর দক্ষিণ পাড়ায় দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হন। সংঘর্ষে মোজাহিদ নামে এক যুবকের ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়।

গত ১১ এপ্রিল বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামে পূর্ব বিরোধের জের ধরে দুদল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে অন্তত ৩০জন আহত হন। একই দিন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে নবীনগর উপজেলার খাজানগর এলাকার কবরস্থানে দাফন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ।

১২ এপ্রিল সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের আঁখিতারা গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩০জন আহত হন।
গত ১০ এপ্রিল কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামের মন মিয়া চৌধুরীর ছেলে ও দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার কসবা উপজেলা প্রতিনিধি মোঃ শাহ আলম চৌধুরীর ছোট ভাই মোঃ ফারুক মিয়া চৌধুরী-(৫৩) প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন। ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়  মারা যান তিনি।

গত ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের বড়নগর গ্রামের বাজারে ঝালমুড়ি খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন বড়নগর গ্রামের ইউছুফ আলীর ছেলে মোঃ রজব আলী-(২০)। পরদিন বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান  তিনি।

গত ১৯ এপ্রিল রাতে ধান মাড়াইকে কেন্দ্র করে নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের জেঠাগ্রামে দুদল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬ পুলিশ সদস্যসহ উভয়পক্ষের ৬৫জন আহত হয়। ২৬ এপ্রিল বিজয়নগর উপজেলার আদমপুরে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩৫জন আহত হন।

গত ২৭ এপ্রিল হামলার বলি ফারিয়া নামে আড়াই মাস বয়সী এক শিশু কন্যা। ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের গোকর্ণ গ্রামে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় বরিশালের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর গ্রামের রাজু মিয়ার শিশু কন্যা ফারিয়া। প্রবাসী রাজু মিয়ার স্ত্রী নাইমা বাবার বাড়ি নাসিরনগরেই থাকতেন। শিশু ফারিয়ার আত্মীয় কবির মিয়ার স্ত্রী জোসনা বেগমের সঙ্গে রাস্তা নিয়ে প্রতিবেশি জসিম মিয়ার কথা কাটাকাটির জেরে এ হামলা হয়।

সর্বশেষ গত বুধবার সকালে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের কাটানিশার গ্রামে মসজিদে যাওয়া নিয়ে গ্রামের মিজান মেম্বার ও ইয়াছিন মুন্সির  লোকদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অর্ধশত লোক আহত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, আমরা যাতে এলাকায় যাতে আর কোন সংঘর্ষ না হয় সেজন্য কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে সচেতন করছি। এলাকার জনপ্রতিনিধিদেরকে নিয়ে এলাকায় যাতে ঝগড়া-ঝাটি না হয় সেজন্য কাজ করছি। তাছাড়া যেগুলোর মামলা হয়েছে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসামী গ্রেপ্তার করছি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।


ইত্তেফাক/আরকেজি