করোনা ভাইরাসের এই মহামারির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে চিকিত্সা সরঞ্জাম। রোগীদের চিকিত্সা দেওয়ার জন্য সামনের সারিতে থাকা চিকিত্সকদের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্টসহ (পিপিই) অন্যান্য জিনিসপত্র। করোনা ভাইরাসের কারণে বেশির ভাগ বিমান সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই ধরনের চিকিত্সাসামগ্রী পরিবহনেও দেখা দিয়েছে প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু করোনা ভাইরাসের এই সংকটের মধ্যেও আকাশে রয়েছে পণ্যবাহী বোয়িং ৭৪৭ বিমান। আকাশের রাণিখ্যাত বোয়িং ৭৪৭ জাম্বো বিমান বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে জরুরি চিকিত্সাসামগ্রী। বিপর্যয়ের মধ্যে আকাশের নায়কের ভূমিকায় যেন বোয়িং ৭৪৭।
৫০ বছর আগে ১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল জাম্বো জেট বিমান বোয়িং ৭৪৭। এই বিমান শুধুই কারিগরি কৌশল ও বিশালতার কারণেই প্রশংসিত নয়; এই বিমানকে মনে করা হয় আভিজাত্যের প্রতীক। বোয়িং ৭৪৭ জাম্বো জেট নামেই বেশি পরিচিত। ৪ ইঞ্জিনের এই বিমান সবচেয়ে সুপরিসরের প্রশস্ত বিমান। এই বিমান যাত্রী বহনের পাশাপাশি পণ্যবাহী বিশাল সুপরিসর বিমান হিসেবেও বিশেষভাবে সমাদৃত।
করোনা ভাইরাস দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রী পরিবহনের সব ধরনের বিমান চলাচল এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেছে। কার্গো, ত্রাণ-সাহায্য, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সসহ কিছু বিশেষ বিমান চালু থাকলেও তা সীমিত। ক্ষতির কথা বিবেচনা করে অনেক কার্গো বিমান পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্স তাদের সেবা পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। এর অন্যতম কারণ কার্গো সেবা চালু রাখা অনেক এয়ারলাইন্সের অর্থনৈতিক অবস্থাই এখন নাজুক।
কার্গো বিমান সেবা দিয়ে থাকে এই ধরনের এয়ারলাইন্সের মধ্যে সিল্কওয়ে এয়ারলাইন্স, অটলাস এয়ার, এয়ার ব্রিজ কার্গো এবং কার্গোলাক্স অন্যতম। এদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা প্রত্যেকেই পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করে বোয়িং ৭৪৭-এফ। বোয়িংয়ের মালবাহী এই বিমানটি করোনা ভাইরাসের এই মহামারির মধ্যে এত জনপ্রিয়তা পাওয়ার মূল কারণ এটি বিপুল পরিমাণ চিকিত্সাসামগ্রী পরিবহনে সক্ষম। এ কারণে শুরু থেকেই কার্গো বিমান সেবাদাতা এয়ারলাইন্সগুলোর প্রথম পছন্দ ছিল মালবাহী বোয়িং ৭৪৭। যাত্রী পরিবহনের বোয়িংয়ের গুরুত্ব কিছুটা কমে এসেছিল গত কয়েক বছরে। কিন্তু মহামারি শুরুর পর পণ্য পরিবহনে হঠাত্ করেই আবার বেড়েছে মালবাহী বোয়িংয়ের গুরুত্ব।
মস্কোভিত্তিক এয়ারলাইন্স কোম্পানি এয়ার ব্রিজ কার্গোর (এবিসি) কাছে বর্তমানে ১৭টি পণ্যবাহী বোয়িং ৭৪৭ রয়েছে। মহামারি শুরুর পর থেকে দিনে ১৫ ঘণ্টার বেশি আকাশে থাকতে হচ্ছে পণ্যবাহী বোয়িং ৭৪৭ বিমানগুলোকে। মার্চের পর থেকে তাদের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এবিসির একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, করোনা মহামারিকালে পণ্যবাহী বিমানগুলোকে যেভাবে কাজ করতে হচ্ছে তা আগে কখনো ছিল না। বিশেষ করে জীবন রক্ষাকারী চিকিত্সাসামগ্রী, ওষুধসামগ্রী পরিবহনে এসব বিমান দারুণ অবদান রেখে চলেছে। আকারে অনেক বড়ো হওয়ায় বোয়িং তা চমত্কার ভূমিকা রাখতে পারছে। এছাড়া এর তিনটি প্রকোষ্টে ৪ ডিগ্রি থেকে শুরু করে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকায় তা ওষুধের মান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিমানটির সামনের অংশের উপরি ভাগের হাম্প বা কুঁজ একে বিশ্বের সবচেয়ে ভিন্নধর্মী বিমানে পরিণত করেছে। এই হাম্প স্টাইলটি আপার ডেক হিসেবেও পরিচিত। আলাদা করে এর একটি বো স্টাইলের দরজা রয়েছে, সেখান দিয়ে মালামাল লোড আনলোড করা হয়। অনেক বড়ো আকারের হওয়ার কারণে এটি অনেক বেশি চিকিত্সা সরঞ্জাম বহন করতে পারছে। করোনা ভাইরাসের এই মহাদুর্যোগের মধ্যে বোয়িংয়ের এই ভূমিকাই হয়তো এটিকে এক সময় ইতিহাসের অংশে পরিণত করবে। —সিএনএন
