করোনার আবহে আমার নির্মীয়মাণ ‘পরিক্রমা’

আপডেট : ০৬ মে ২০২০, ২১:৩৭

আমরা ছোটোবেলায় উত্তরবঙ্গের দুর্বার, নির্মল তিস্তাকে দেখেছি। কী তার বিস্তার! কী তার গর্জন! কয়েক মাস আগে গিয়ে দেখলাম, তিস্তা শুকনো। নালার মতো স্রোত বইছে। গায়ে তার অকালবার্ধক্যের চিহ্ন। জলহীন, স্রোতহীন ব্রাত্য নদীর মতো ধুঁকছে

ইতিহাসে আমরা প্লেগ বা স্প্যানিশ ফ্লুর ধ্বংসকাণ্ড পড়েছি। বড়ো বড়ো দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক পরিণতির গল্প শুনেছি। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে এরকম আতঙ্ক, এরকম সংক্রমণ, মৃত্যুর এরকম মিছিল কখনো দেখা যায়নি। প্লেগ বা স্প্যানিশ ফ্লু কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ ছিল। সারা বিশ্বে একই সঙ্গে থাবা বসাতে পারেনি। তখন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। খবর ছড়াত দেরিতে। আজ কোথাও কোনো অঘটন ঘটলেই সারা বিশ্বে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ভয় কাটাতে, আত্মরক্ষার্থে সতর্ক হয়ে ওঠে। করোনায় আক্রান্ত পৃথিবীর তিনটি স্পষ্ট চেহারাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানুষ একসঙ্গে লড়ছে, একসঙ্গে লকডাউন মেনে নিয়ে প্রবল সতর্কতা অবলম্বন করছে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। তৃতীয়ত, নানা স্তরের বিজ্ঞানী ও চিকিত্সকেরা সংক্রামক অতিমারির হামলা রুখতে ঐক্যবদ্ধ। বিশ্ব জুড়ে প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) আবিষ্কারের গবেষণা চলছে। খোঁজ চলছে মারাত্মক রোগটির উত্স কী?

গোটা জীবজগেক, বিশেষ করে মানুষকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হয়। এটাও তাঁর বেঁচে থাকার অন্যতম ধর্ম। লড়তে লড়তে জীবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তার প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে ওঠে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই। সাধারণ জ্ঞান ছুঁয়ে বুঝতে পারি, মানুষের প্রতিরোধের শক্তি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। বিজ্ঞানসম্মত প্রতিষেধক ব্যবস্থা আর প্রাকৃতিক ভারসাম্যও দেহরক্ষার দুই প্রধান অবলম্বন। প্রকৃতিও তার সুস্বাস্থ্য চায়। তার গায়ে হাত পড়লে সে খেপে ওঠে। নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে।

আমরা ছোটোবেলা যে প্রকৃতিকে দেখেছি, আমাদের চারপাশে, আমাদের মতোই সেও তার ‘নেচার’ বদলে ফেলেছে। সে কখনো নিঃশব্দে, কখনো তীব্র আঘাত কষে তার প্রতিরোধ প্রদর্শন করছে। আমি হলফ করে বলতে পারি, ক্ষুব্ধ প্রকৃতি সরাসরি মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। আঘাতের বিরুদ্ধে আঘাত হেনে ধ্বংস থেকে, ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ থেকে রেহাই দাবি করছে।

লকডাউন পর্বে বাড়িতে বন্দি। ছাদে যাই। সকালে-বিকেলে। কখনো রাতে। দেখতে পাই, পরিষ্কার আকাশ। পাখিরা অবাধে উড়ছে। সন্ধ্যায়, ভোরে স্বাভাবিক কোলাহল বাড়ছে। প্রায়ই অনুভব করছি, মুক্ত উত্পাতহীন আবহে প্রকৃতি, প্রকৃতির লালিত পশুপাখি শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কারণ দূষণ কমছে। পারিপার্শ্বিকে কমছে ‘ম্যানমেড’ অশান্তির প্রকোপ। এরকম মুহূর্তে যে কোনো স্পর্শকাতর মানুষের মতো আমিও প্রকৃতির ফিসফাস শুনতে পাচ্ছি। সে মানুষকে সরাসরি বলছে, তোমাদের বাড়াবাড়ি অসহ্য। আমার ওপর অনেক অত্যাচার করেছ। ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছ। এবার আমার প্রতিশোধের পালা শুরু। আমিও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছি। ছাড়ব না। মার খেলে আমিও মারব। 

প্রকৃতি কি কথা বলে? বলে না। কখনো দাপটে, কখনো নিঃশব্দে ব্যক্ত করে তার প্রতিক্রিয়া। আমরা তার নৈঃশব্দ্যে ভাষা খুঁজি। তাকে অনুভব করি অন্তরে ও বাইরে। এটা আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি। বুঝতে পারছি—প্রকৃতি বারবার, বহুবার আমাদের সতর্ক করেছে। আমরা সাড়া দিইনি। সে নানা রকম ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, তোমাদের উন্নয়ন দরকার। করছো, করো। কিন্তু আমার ভারসাম্য নষ্ট কোরো না। প্রকৃতি যখন বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় চিত্কার জুড়ে নড়ে উঠল, তখনো আমরা তার আর্তনাদে কান দিইনি। বরং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে নিউ ক্যাপিটেলিজমের আগ্রাসি মনোভাবের সোহাগী হয়ে তার ব্যবসা, তার ‘খায়েস’ বাড়িয়ে তুলেছি। নব্য পুঁজিবাদ দেখেছে, অল্প অর্থব্যয়, সস্তা মজুরি দিয়ে আয়বৃদ্ধি সম্ভব। এটাই তার বিশ্বায়নের, তার বাজার অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য। আনএনডিং প্রফিট (অন্তহীন মুনাফা) দিয়ে সে তার বৃদ্ধি চাপিয়ে দিচ্ছে।

আগে বিভিন্ন সংস্থার স্ট্যার্ন্ডাড ছিল ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মুনাফা। এখন তাদের দাবি, কম খরচে ২০০ থেকে ৩০০ ভাগ আমাদের পেতেই হবে। মুনাফার নেশায় ওরা পাগল হয়ে উঠছে। ওদের সংহত উন্মাদনায় প্রকৃতি আক্রান্ত। বিধ্বস্ত। উন্নয়নের নামে মুনাফা, মুনাফার নামে উন্নয়ন বাজার অর্থনীতির সুপরিকল্পিত অঙ্ক। জল ও জঙ্গলকে অবাধে ব্যবহার করো। নিজের শক্তি বাড়াও। অরণ্য আর চাই না। কেটে সাফ করে দাও। রুদ্ধ করো জলের স্বাভাবিক গতিকে। আমাদের ক্ষমতামত্ততার দাসত্ব জঙ্গলকে, জলকে মানতে হবে। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী, আফ্রিকা থাকে আমাজন সর্বত্র এই ভয়ংকর লীলা চলছে। কেননা করপোরেটের আরো বেশি উত্পাদন চাই। খনিজ চাই। চাই অতিরিক্ত বিদ্যুত্। বিদ্যুত্ এখন আর নিছক পরিষেবা নয়, পণ্য। শেয়ারমার্কেটে বিক্রি হয়। মুনাফা জোগায়। নদীকে রুদ্ধ করে বিদ্যুতের উত্পাদন, জঙ্গল কেটেকুটে তার নির্জনতার উচ্ছেদ প্রকৃতি আর কতদিন সহ্য করবে? করছে না। রুখে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিশোধ নিতে চাইছে।

আমরা ছোটোবেলায় উত্তরবঙ্গের দুর্বার, নির্মল তিস্তাকে দেখেছি। কী তার বিস্তার? কী তার গর্জন? কয়েক মাস আগে গিয়ে দেখলাম, তিস্তা শুকনো। নালার মতো স্রোত বইছে। গায়ে তার অকালবার্ধক্যের চিহ্ন। জলহীন, স্রোতহীন ব্রাত্য নদীর মতো ধুঁকছে। শুধু কি তিস্তা? বিশ্বে অসংখ্য নদনদী মানুষের হস্তক্ষেপে, মানুষের লোভের শিকার হয়ে মৃত্যুর দিকে হাঁটছে। জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ। আরোপিত ধ্বংসকাণ্ডে, দূষণে বিকৃত রাশি রাশি জল। জলস্থলে ভারসাম্য বিনষ্ট। প্রকৃতি রুষ্ট। ক্ষুব্ধ। এসব কথা বলবার খানিকটা অধিকার আমার আছে। তা প্রসঙ্গত একটু বলা দরকার।

ইতালির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমি তিন ভাষায় (হিন্দি, ইংরেজি, ও ইতালিয়ান) একটি চলচ্চিত্র তৈরি করছি। তার বিষয়, প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার। মূল কাহিনি একজন ইতালিয়ান তরুণ লেখকের। বিদেশি কাহিনিটির ভিত্তিতে তথ্য ও তত্ত্ব সাজিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে।

মানুষ কীভাবে আমাদের চারপাশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, কীভাবে জঙ্গলে কোপ বসিয়ে, নদীর পর নদীকে রুদ্ধ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিটেচ্যুত, ভূমিহারা মাতৃহারা করে দিচ্ছে—নিঃশব্দ প্রকৃতিও কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে—এরকম বহু প্রসঙ্গকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মূল কাহিনি ও তার ত্রিভাষিক চিত্রনাট্য। প্রধান চরিত্র একজন ইতালিয়ান লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। ইকোলজি নিয়ে ছবি বানাতে ভারতে এসেছেন। নানা প্রান্তে ঘুরছেন। স্ত্রী অকালপ্রয়াত। একটি ছেলে আছে। বয়স ১২। ছেলেটিকে রেখে এসেছেন। সে বাড়িতে নিঃসঙ্গ। বিষণ্ন। বই আর সোশ্যাল মিডিয়া তার সঙ্গী।  

মুম্বাইয়ের জুহুবিচে তথ্যচিত্র নির্মাতা ইতালিয়ান লেখকের সঙ্গে, তারই ছেলের সমবয়সি এক বালকের দেখা হয়। তার আদি বাড়ি মধ্যপ্রদেশ। সে এখন ভিটেহীন। উদ্বাস্তু। বাড়িঘর প্রকৃতির প্রতিশোধে ভেসে গেছে। ইতালিয়ান তথ্যচিত্র নির্মাতা ভারতীয় ছেলেটির বর্ণনা শুনতে শুনতে একটা মিল খুঁজে পান নিজের একমাত্র সন্তানের সঙ্গে। তার সন্তান মাতৃহীন আর এই ভিটেচ্যুত ভারতীয় ছেলেটি মাতৃভূমিহীন। দুজনেই অসহায়। নিঃসঙ্গ।

 আমার নির্মীয়মাণ এই ছবির হিন্দি টাইটেল পরিক্রমা। ইংরেজি ও ইতালিয়ান টাইটেল ভেবে রেখেছি। অন্যান্য কাজ চলছে। ছবিটির শুটিং করতে ডিসেম্বরের শেষে আমাকে ইতালি যেতে হয়। সঙ্গে আমার স্ত্রী নীলাঞ্জনা। সব প্রস্তুতি নিয়েই আমরা ১০ জানুয়ারি থেকে দক্ষিণ ইতালির নেপলস আর প্রসিদা আইল্যান্ডে শুটিং শুরু করি। টিমের প্রায় সব সদস্য ইতালিয়ান। সহপ্রযোজকও ইতালির। চীনে তখন করোনা সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ছে। ভয় ঘুরছে ইতালিতে। তখন আমার ইতালিয়ান বন্ধু, পরিক্রমার সহপ্রযোজক আড্ডায় একাধিকবার বলেছে, এটা এমন কিছু নয়। কমন ফ্লু। প্রতি বছর সংক্রমক জ্বরে বয়স্ক লোক আক্রান্ত হন। কেউ কেউ মারা যান। দক্ষিণ ইতালি থেকে এরপরই আমি আর নীলাঞ্জনা সরাসরি কলকাতায় ফিরে আসি। চলে আসার আগে আমার কখনো মনে হয়নি, ইতালিয়ান বন্ধুরাও ভাবেনি, কমন ফ্লু এক ভয়ংকর মহামারির চেহারা নিয়ে গোটা বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে দেবে।

শুটিংয়ের ইতালীয় পর্ব শেষ, ভারতে শুটিং বাকি। ইতালিয়ান অভিনেতা মার্ক লিওনার্দি ও অন্যান্য কলাকুশলীকে নিয়ে আসতে হবে। পরের শুটিং কবে শুরু করতে পারব, জানি না। যেমন সারা বিশ্ব জানে না, কখন, কীভাবে অতিমারি করোনার হাত থেকে আমরা রেহাই পাব। দুনিয়া লড়ছে। আশা করি, প্রতিষেধক খুঁজে বের করবে এবং আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়েও ব্যাপক ভাবনাচিন্তা শুরু হবে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় আরো বেশি সজাগ হয়ে উঠবে। বলবে, উন্নয়ন হোক কিন্তু ধ্বংস নয়। নয় জলজঙ্গলে মানুষের অপকাণ্ডের বিস্তার।

আমি এখন বাড়িতে আটক। চারপাশে নিয়মের অবরোধ। এ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। দমবন্ধ অবস্থা, মেনে নিতে হচ্ছে। বহু ধ্যানধারণা বদলে যাচ্ছে। বাড়ি বসে স্ক্রিপ্ট রিভাইজ করছি। কাজ করতে করতে অবাক লাগছে, প্রকৃতির নষ্ট, বিধ্বস্ত ভারসাম্য নিয়ে আমার ছবিটির সঙ্গে এই সময় আর দৃষ্টান্তহীন সংকটের মিল কী অদ্ভূত! সময়কে নিঃসময় করে তোলার তাগিদ অনুভব করছি। করোনাজাত সংক্রমণ, সংকট ও মৃত্যু প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে গল্পের আদলে। আদলের বিস্তৃতিতে।

n লেখক :ভারতীয় চিত্রপরিচালক