ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
একজন সন্তান মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসে। মা রত্নগর্ভা হয়ে ওঠেন সন্তানের সাফল্যে। তেমনই একজন সাধারণ মা রুছমতের নেছা, যিনি মহিমান্বিত হয়েছেন সন্তানের বহুমাত্রিক অবদানের মাধ্যমে। মা আবেগ আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বলেন, আমার ছেলে রাজার মতো দেখতে ছিল। সবাই আমাকে বলত চানকপালের মা। সারা জীবন সে মানুষের উপকার করেছে। কখনো তার কাছ থেকে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে আসেনি। আমার ছেলের মতো এই দেশে কোনো ছেলেই ছিল না। দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গেছে। আমি সারা দিন কান্নাকাটি করেছি। সবাইকে বলেছি ওকে একটু আসতে বলো, যেন সোনা মুখটা একটু দেখে পিপাসার্ত চোখটা জুড়াতে পারি। ছেলে বলত মা, ‘কেঁদো না, আমি দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়ছি। ভালোই আছি।’ মায়ের আদরের সেই ছেলেটি ছিলেন জনমানুষের শিক্ষক শহিদ আহসানউল্লাহ মাস্টার। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন মহা অর্জনের জন্য মহা ত্যাগ দরকার। ত্যাগ ছিল মানুষটির জীবনের ব্রত। দেশকে কেবল অকাতরে দিয়েছেন, বিনিময়ে কিছুই চাননি। কখনো প্রতিদানের আশাও করেননি। একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্মুখযুদ্ধ করেছেন। তিনি তার দলে প্রধান ছিলেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) এবং প্রধান শিক্ষক (১৯৮৪-২০০৪) হিসেবে আমৃত্যু তার যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষা দিয়েছেন, তার নিজের জীবনেও তিনি এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর চিরচেনা সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে তিনি সহজ-সরল জীবনের পরিচয় দিয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবে জীবনের ২৫টি বছর তিনি অতিক্রম করেছেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি ছিলেন রাজনীতির শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের শিক্ষক। তার রাজনীতির মূল বিষয় ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী দেশপ্রেমিক একজন নেতার প্রতিকৃতি। তিনি গতানুগতিক স্বার্থবাদী রাজনীতির পরিবর্তে মানুষের কল্যাণের রাজনীতির দর্শনকে ধারণ করেছিলেন। তিনি রাজনীতির শিক্ষক এ কারণেই যে, তিনি মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ করতেন।
দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা, রাজনীতি, শ্রমের বিস্ময়কর মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন শ্রমিকদের শিক্ষক। তিনি ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯০, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী মানুষের শিক্ষক ও নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করার জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই মামলা লড়াইয়ের জন্য ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ শ্রমিকদের বিভিন্নমুখী কল্যাণকর কাজের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের শিক্ষক। খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে শহিদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে। কারণ তিনি ছিলেন পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদ। কর্মী থেকে তিনি জননন্দিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি মহাপুরুষ। সে সময় বিএনপি-জামায়াতের আগ্রাসনে মানুষ ভাবতে বসেছিল গণতন্ত্র আর হয়তো ফিরে আসবে না। মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি যেমন সম্মুখযোদ্ধা ছিলেন, গণতন্ত্রের লড়াইয়েও তিনি ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে রক্ত দিয়েছেন, অন্যায়ের শিকার হয়েছেন কিন্তু কোনোভাবেই এই মহান মানুষটিকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। তিনি মাদক, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কোনো অপশক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের আপস তিনি করেননি। তিনি এভাবেই মাটি ও মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করে গেছেন। অপশক্তি এটি মেনে নিতে পারেনি। তাকে হত্যা করলে গণতন্ত্রকে হত্যা করা যাবে বলে ভেবেছে। বুলেটের আঘাতে রক্ত ঝরেছে মানুষটির। মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছেন। তার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যে জনমানুষের জাগরণ ঘটেছিল তা ইতিহাসে বিরল। জনতার এই প্রতিবাদ প্রতিরোধে পরিণত হয়, শোক পরিণত হয় শক্তিতে। খুনিরা শহিদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী একজন নেতাকে।
n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
