আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো Economic Sanction বা অর্থনৈতিক অবরোধ। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এটা এখন একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সবসময় এই অস্ত্র কার্যকর বলে প্রমাণিত নাও হতে পারে। অনেক সময় এটি তার উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থও হয়।
অর্থনৈতিক অবরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীনকাল থেকেই এর অস্তিত্ব বিদ্যমান, তবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এর ধরন ভিন্ন ছিল। মধ্যযুগে কোনো শহর বা দুর্গ জয় করার জন্য তা অবরোধ করা হতো যাতে বাইরে থেকে সেখানে খাদ্যশস্য না যেতে পারে। এটিকেও বলা যেতে পারে একধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ। তখন এটি যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহূত হতো। তবে সবসময়ই যে এই অবরোধ-অস্ত্র সফল হয়েছে তা বলা যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক ‘বার্লিন অবরোধ’ও একধরনের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়ে। তবে বর্তমানে এর ধরন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবী এখন এক জটিল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। প্রত্যেকটা দেশই এখন অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নিবিড়ভাবে জড়িত। তবে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ অস্ত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব দেশ সমান সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। এক্ষেত্রে অনেকটা একক কর্তৃত্ব উপভোগ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তার ‘অনন্য ব্যাংকিং এবং মুদ্রা ব্যবস্থা’র কারণে সে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে।
বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের অধিকাংশই সংঘটিত হয়ে থাকে মার্কিন ব্যাংকব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে। বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ইউএস ডলার এখনো একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। যদিও সামপ্রতিককালে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ান খুবই অল্পপরিসরে ব্যবহূত হচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিশ্বব্যাপী সামরিক এবং অর্থনৈতিক বন্ধু রাষ্ট্র। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অর্থনৈতিক অবরোধকে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। এই অস্ত্র সে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, দূরপ্রাচ্যের উত্তর কোরিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার কিউবা, ভেনিজুয়েলা থেকে শুরু করে একসময়ের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়ার উপরও প্রয়োগ করছে।
দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক অবরোধ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কমিউনিস্ট কিউবা অনেকটা সফলভাবে টিকে আছে। তবে বেশকিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ অস্ত্রটি বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। ইরানের অর্থনীতি খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। দেশটির মুদ্রার মান সত্তর শতাংশ কমে গিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তাদের দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাধ্য হচ্ছে ইরান থেকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিতে। কারণ এসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিংব্যবস্থার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
আবার সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলো কাতারের একধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে যা তার উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কাতার তার মিত্রদের সাহায্যে সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে যখন সামরিক বাহিনী দেশের ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করে তখন আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে থাকে যা বেশ কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের উপর এই অস্ত্র বেশ ভালোভাবেই কাজ করেছিল। সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়েছিল দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংস্কার আনতে। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায় অর্থনৈতিক অবরোধ কোনো একটা দেশের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে। তবে অবশ্যই দেশটিকে অস্ত্রটি সফলভাবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। অর্থনৈতিক অবরোধ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কিত বিষয়। নৈতিকভাবে এটি কতটা সমর্থনযোগ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

