হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কূটনীতি!

আপডেট : ১০ মে ২০২০, ২০:৫৯

তালেব রানা

 

নতুন করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায় ওষুধের প্রয়োগ নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ ওষুধ। এই ওষুধ ম্যালেরিয়া, লুপাস এবং রেউমাটোইড আর্থাইটিসের চিকিত্সায় প্রয়োগ করা হয়। গত এক মাসে বিভিন্ন সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ওষুধের কথা বারবার উল্লেখ করায় এটি নিয়ে আলোচনাও বেশি হয়েছে।

এই বিষয়টি আরো আলোচনায় আসে যখন ভারত এই ওষুধ রপ্তানিতে আপত্তি জানায়। জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূল্য দিতে হবে বলে সতর্ক করেন। এরপর ভারত এই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ রপ্তানি করতে সম্মত হয়। যে কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুর বদল করে ট্রাম্প বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভালো মানুষ। মোদি মহান! টুইট বার্তায় তিনি বলেন, এই রকম নজিরবিহীন অবস্থায় বন্ধুদের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দরকার। এই সাহায্যের কথা ভোলার নয়। এই লড়াইয়ে শুধু ভারতকেই নয়, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে মোদি মানবতাকে সাহায্য করেছেন। নরেন্দ্র মোদি, আপনাকে ধন্যবাদ। ইতিমধ্যে ভারত থেকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে।

ট্রাম্পকেও বন্ধত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টুইটে মোদি বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পুরোপুরি একমত। এরকম সময়ই বন্ধুদের কাছে আনে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানবজাতির এই লড়াইয়ে সম্ভাব্য সবকিছু ভারত করবে, পাশে দাঁড়াবে। এই লড়াই একসঙ্গে জিততে অঙ্গীকারবদ্ধ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র।

শুধু ট্রাম্প নন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো নরেন্দ্র মোদির ঢালাও প্রশংসা করেছেন। তিনিও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন তৈরির জন্য কাঁচামাল চেয়েছিলেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের অনুরোধও রেখেছেন মোদি। এরপরই বলসোনারো টুইট করে বলেন, আমাদের আরো সুখবর আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলাম। শিগিগরই আমরা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ তৈরির কাঁচামাল পেয়ে যাব। এই ওষুধ দিয়ে করোনা, ম্যালেরিয়া, বাতের রোগীদের চিকিত্সা করতে পারব। ব্রাজিলের মানুষদের সময়োচিত সাহায্য করার জন্য ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ধন্যবাদ।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ওষুধ পাঠানোর সিদ্ধান্তের জন্য। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশও ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যা ভারতের জন্য কূটনৈতিক বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের অর্জন।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব লব আগরওয়াল জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশকে দিয়েও ভারতের নিজের জন্য প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন মজুত থাকবে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে আমাদের অসুবিধা হবে না।

ট্রাম্প জোর গলায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের কার্যকারিতার দাবি করলেও ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায় এর কার্যকারিতা এখনো প্রমাণিত নয়। ফ্রান্সের গবেষকরা বলছেন, ইতিমধ্যে তারা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখেছে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন করোনা চিকিত্সায় কাজ করে। ট্রাম্প বলছেন, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ক্ষতিকর নয়। বিভিন্ন সময় ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এটি আপনাকে মেরে ফেলবে না।  আপনার হারানোর কী আছে, এটি ব্যবহার করুন। কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, এই ওষুধের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা সিএনএনকে বলেছেন, ফ্রান্সের এই গবেষণা সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং করুণ।

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কার্যকর কি না, সেটি নির্দিষ্ট না হলেও ভারতের জন্য এটি কূটনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।  করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংহতি অর্জনে নরেন্দ্র মোদি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এবং মতৈক্য পৌঁছেছেন।

গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্কের দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকে সার্ক অঞ্চলে মহামারি মোকাবিলায় জরুরি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ভারত সরকার এই তহবিলে এক কোটি ডলার দিয়েছে। এছাড়া এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মরিশাস ও সিসেলকে ওষুধ দেবে ভারত।

ভারতের এই নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কাজ করবে কি? আলজাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরো জোরাল করবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কনওয়াল সিবাল আলজাজিরাকে বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব অর্জন করতে পেরেছে ভারত। কারণ ভারত এই দুর্যোগের মুহূর্তে অর্থ আয়ের জন্য নয় বরং আন্তর্জাতিক সংহতির জন্য সত্যিকারের ত্যাগ স্বীকার করেছে। অবশ্যই ভারতের কূটনৈতিক শক্তি বাড়বে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ললিত মানসিংয়ের মতে, লেনদেনের শর্তে কূটনীতির আলোচনা উচিত নয়। এই সংকটময় মুহূর্তে যখন কোনো দেশ ওষুধের জন্য আবেদন করে—তখন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানবতার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। সংকটে থাকা নির্দিষ্ট দেশের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের বিষয়টি থাকে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিক সেন্টিমেন্ট। তার দাবি, জরুরি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত তার নীতি থেকে সরে আসেনি। বিশেষ করে ওষুধ খাতে। এইচআইভি/এইডসের চিকিত্সায় সহায়তা করার নীতি ভারতের রয়েছে। আফ্রিকায় লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছে ভারতের তৈরি ওষুধ।