সালেহউদ্দিন
আলমাছ উদ্দিনের কথা মনে আছে আপনাদের? মুক্তিযাদ্ধা আলমাছ উদ্দিন আজ থেকে ৪৩ দিন আগে অ্যাম্বুলেন্সে ১৬ ঘণ্টায় ৬ হাসপাতালে ভর্তির জন্য ছোটাছুটি করে অতঃপর বিনা চিকিত্সায় মারা গিয়েছিলেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। ২৮ মার্চ শনিবার সকাল ৮টায় আলমাছ উদ্দিনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার বাসাবোর বাসা থেকে প্রথমে শাহবাগের একটি বড় হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। সেখানে বুকের এক্স-রে করে নিউমোনিয়া মতো মনে হচ্ছিল। করোনা ভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে দেখে তারা সেখানে রাখেনি। সেখান থেকে তারা ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেন। কর্তৃপক্ষ রাখতে রাজি হলেও চিকিত্সকেরা আসেননি। ঐ হাসপাতাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। ভর্তি নেয় তারা। কিন্তু জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে পাঠানোর সময় চিকিত্সকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য না পেলে রোগী রাখবেন না বলে জানান। এরপর তারা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যান। সেখানে লক্ষণ দেখে বলা হয়, রোগী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে আইসোলেশনে থাকতে হবে। এভাবে ছয় হাসপাতাল ঘুরে রাত ১২টায় স্বজনরা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালের সিটিস্ক্যান, এমআরআই মেশিন নষ্ট। রাত পোহালে তার চিকিত্সা শুরু করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন চিকিত্সক। রাত ঠিকই পেরিয়ে ছিল। কিন্ত আলমাছ উদ্দিন বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেননি।
বিনা চিকিত্সায় আলমাছ উদ্দিনের করুন মৃত্যুর পর এই ৪৩ দিনে বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর সারি আরো অনেক দীর্ঘ হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগুরুত্বপূর্ণ কত লোকই ছিলেন, সবাই সেভাবে সংবাদের শিরোনাম হতে পারেননি। গত রবিবার বিনা চিকিত্সায় আরেকটি করুণ মৃত্যুর সংবাদ গণমাধ্যমে খুবই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ ছিলেন একজন কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী। ডায়ালাইসিসের সময় প্রায়ই তার প্রেসার বেড়ে যেত, শ্বাসকষ্ট হতো, ফুসফুসে পানি চলে আসত। আইসিইউ সাপোর্ট হলে ঠিকও হয়ে যেত। গত বৃহস্পতিবার ডায়ালাইসিসের সময় তার প্রেসার বেড়ে গেলে ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় তারা আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না। পরে গৌতম আইচের চিকিত্সক কন্যা সুস্মিতা তার বাবাকে নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে যান। কিন্তু করোনা সন্দেহে তারা ভর্তির অপারগতা প্রকাশ করে সুস্মিতা মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। তারাও টেস্ট করানোর কথা বলে স্কয়ারে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখান থেকে আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে নিয়ে গেলে তারা পেশেন্টকে দেখেনি, চেকও করেনি। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় স্কয়ার হাসপাতালে। স্কয়ার থেকে বলা হয়, ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়, আমরা টেস্ট বন্ধ করে দিয়েছি। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালে। তারা বলে, এই পেশেন্টকে কার্ডিয়াক সাপোর্ট দেওয়া দরকার, কিডনির পেশেন্ট। আমাদের এই সাপোর্ট শুরু হয়নি, আমরা পারব না। সেখান থেকে সুস্মিতা সোহরাওয়ার্দী কার্ডিয়াকে যান তারাও রাখতে পারবে না বলে জানায়। তারপর মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালসহ আশপাশে এমন কোনো হাসাপাতাল নেই যেখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হয়নি। পরে কোনো উপায় না পেয়ে করোনার উপসর্গ না থাকলেও তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। সেখানে একপ্রকার বিনা চিকিত্সায় মারা যান তিনি। শুধু করোনা সন্দেহে তিন সপ্তাহ আগে এক রত্নগর্ভা মায়ের লাইভ সাপোর্ট খুলে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয় ইউনাইটেড হাসপাতাল। ওই নারী আইসিইউর সাপোর্ট না পেয়ে পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে মারা যান। রত্নাগর্ভা ওই জননীর ছেলে বিশ্বব্যাংকের কর্মকতা ড. জিয়া উদ্দিন হায়দার তার মায়ের বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সরকারের ভুল নীতির ফলেই নন-করোনা রোগীদের চিকিত্সা না পাওয়ার ঘটনা এবং করুণ মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলছে। জেনে হোক, না জেনেই হোক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নন-করোনা রোগীদের জন্য একটি ‘মৃত্যু ফাঁদ’ তৈরি করেছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি ১১০টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সুবিধাসম্পন্ন বড়ো বড়ো হাসপাতাল রয়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর এসব প্রতিষ্ঠানকে চিকিত্সার বাইরে রাখা হয়েছে। সংক্রমণের ভয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজ থেকে বন্ধ করে রেখেছে। আবার যেগুলো চালু আছে, সেখানে করোনা চিকিত্সার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে করোনার উপসর্গ থাকলে এবং নেগেটিভ রিপোর্ট না থাকলে সাধারণ রোগীরা ভর্তি হতে পারছেন না। যারা ভর্তি হয়েছেন উপসর্গ ধরা পড়লেই তাদের সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। সরকার যেহেতু করোনার জন্য কিছু হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সেহেতু ঐসব হাসপাতালের যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। আবার করোনার হাসপাতালের গিয়ে ওই সব রোগীরা আরেক বিড়ম্বনায় পড়ছেন। ওই সব হাসপাতালে যাওয়ার পর তারা বলে রোগীর যেহেতু করোনার পজিটিভ সনদ নেই সেহেতু ভর্তি করা সম্ভব নয়। ভুল এই নীতির ফাঁদে পড়ে বিনা চিকিত্সায় মারা যাচ্ছেন অনেক মানুষ। দুই মাস আগে রাজধানীর বড়ো বড়ো বেসরকারী হাসপাতালগুলো করোনা চিকিত্সার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে দরখাস্ত দেয়। অনেকদিন ঝুলিয়ে রেখে নামেমাত্র কয়েকটি হাসপাতকে অনুমতি দেয় সরকার। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ১৫টি পিসিআর ল্যাব আছে। যাদের দৈনিক ২৫/৩০ হাজার টেস্ট করার সক্ষমতা রয়েছে। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে পারত। সরকার সারা দেশ থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে শুধু পরীক্ষার জন্যও তাদের দিতে পারত।
কিন্তু এখনো সরকার সে সুযোগ কাজে লাগায়নি। ফলে সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও ব্যাপক হারে টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রবাসী যেসব চিকিত্সক যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে আছেন, তারা বাংলাদেশে যেসব চিকিত্সার সুযোগ আছে তা কাজে লাগানোর জন্য সরকারের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। প্রস্তাবে প্রত্যেকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে তিনটি জোনে ভাগ করতে বলা হয়েছে। কোভিড, নন-কোভিড ও প্রাথমিক জোন। করোনা সন্দেহভাজন রোগীরা প্রাথমিক জোনে অবস্থান করবেন। নমুনা পরীক্ষার পর পজিটিভ হলে কভিড জোনে তাকে ভর্তি করা হবে। আর করোনা নেগেটিভ হলে নন-কোভিড জোনে ভর্তি করা হবে। হাসপাতালেই পৃথক জোন করা হলে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে না। এটি করা সম্ভব হলে করোনার রোগীদের পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চিকিত্সা প্রদান সম্ভব হবে। কিন্তু এ ধরনের সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও কেন সরকার তা গ্রহণ করছে না—সেটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকার অনেক কিছুই করছে কিন্তু ঠিক সময়ে তা করছে না। সরকার হয়তো বাধ্য হয়ে সেই পথেই যাবে, কিন্তু অনেক মূল্যের পর।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
