ইত্তেফাক রিপোর্ট
এপ্রিল ও মে মাসের সব ঋণের সুদ স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো দাবি করছে এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় কমে যাবে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোর কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে চেয়েছে, ঠিক কী পরিমান সুদ কমে যাবে তার তথ্য। গতকাল এ সংক্রান্ত চিঠি ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হয়েছে। তথ্য জানার পর স্থগিতকৃত সুদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসের স্থগিতকৃত সুদের পরিমান নির্দিষ্ট ফরম্যাটে আগামী ১৪ মে মধ্যে জানাতে হবে। আর মে মাসের স্থগিতকৃত সুদের পরিমান ৭ জুনের মধ্যে জানাতে হবে। চিঠির সঙ্গে তথ্য পাঠানোর একটি ফরম্যাট সংযুক্ত করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ৩ মে জারি করা সার্কুলারে বলা হয়, ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সব ঋণের সুদ স্থগিত থাকবে। এই সময়ের সুদ ব্যাংকগুলো সুদবিহীন ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখবে। পরবতী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই সুদ আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। ৩১ মার্চ পর্যন্ত যত ঋণ আছে সব ঋণের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।
উল্লেখ্য, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুঅেরার ঋণের পরিমান ১০ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের কোন সুদ উল্লেখিত দুইমাসে আদায় করা যাবে না। তবে নতুন ঋণ বা ১ এপ্রিল পর থেকে বিতরণকৃত ঋণের সুদ আদায় করতে পারবে ব্যাংকগুলো।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ১ এপ্রিল থেকে সব ঋণের সুদ ৯ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকের আয় অনেকটা চাপের মধ্যে পড়েছে। এখন দুইমাসের সুদ স্থগিত থাকায় প্রতিমাসে ব্যাংকগুলোর ৮ হাজার কোটি টাকা আয় কম হবে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিভাবে এটি সমন্বয় করতে বলে সেটি দেখার বিষয়।
করোনার কারণে কৃষি, ব্যবসা ও সেবাখাতের সকল প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে। লকডাউনে বন্ধ থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এই সময় নিত্যদিনের খরচ মেটানোই চ্যালেঞ্জ। এরমধ্যে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ। এসব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঋণের সুদ স্থগিতের আশ্বাস দেন। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এপ্রিল ও মে এই দুইমাসের সুদ আদায় না করতে নির্দেশ দেয়। এই সময়ের সুদ ব্যাংকের সুদবিহীন ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকগুলোতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমানতের পরিমান ১১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই আমানতের মধ্যে ঋণ দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এই দুই মাসের ঋণের সুদ স্থগিত করা হলেও আমানতের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হবে। এতে চাপে পড়বে ব্যাংকগুলো। করোনার সময় নতুন করে আমানত বৃদ্ধির সম্ভাবনাও কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর আয় অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা কমে যাবে। এতে ছোট ছোট ব্যাংকগুলোর টিকে থাকায় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। মুনাফা অনেক কমে যাবে বড় বড় ব্যাংকেরও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এখন সবকিছু বন্ধ। জানুয়ারি-জুন সময়ে ঋণ আদায় না হলেও খেলাপি না করার নির্দেশ রয়েছে। অর্থাত্ ঋণের টাকা আদায় হবেনা । মানুষের আয় কমে যাওয়ায় আমানত বাড়বে না। এরমধ্যে সরকার প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে ৩৮ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঅর্থায়ন করবে। সরকার নিজে কিছু অর্থ দেবে। অন্তত অর্ধেক অর্থাত্ ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকেই। এই তারল্য সংকটের আশঙ্কার মধ্যে আয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নতুন সংকট সৃষ্টি করবে।
এদিকে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব ব্যাংকগুলোকে দেওয়ার আগে কিছু নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নগদ জমা সংলরক্ষণ (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার নেওয়ার পদ্ধতি রেপোর সুদহার কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর কেনা সরকারি বিলবন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাাংকগুলোর ঋণ দান সক্ষমতা বাড়াতে ঋণআমানত সীমা (এডিআর) বাড়ানো হয়েছে।
