চলছে করোনাকাল। বিশ্ব জুড়ে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে এই মরণব্যাধি করোনা। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যদ্বাণী করেছে একটি সমূহ দুর্ভিক্ষের। করোনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঙ্ক্ষিত খাদ্য উত্পাদন বন্ধ থাকার কারণে অনেক দেশ তাদের খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল, গম ও ভুট্টা উত্পাদনে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দেওয়ায় এ ফসলগুলোই খাদ্যের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে বেশি। এসব বিষয়ে অধিকতর খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে যে কোনোভাবেই হোক খাদ্য উত্পাদনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে গোটা বিশ্ব।
বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি কৃষি পরিবারকে যাতে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রাখে এবং যে যেখানে পারে সেখানেই শাক-সবজিসহ অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় ফসল আবাদ করার পরামর্শ প্রদান করেছেন। কারণ তিনি বলেছেন যে আমাদের দেশের মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়া ফসল উত্পাদনের জন্য খুবই উপযোগী। যেখানেই বীজ পুঁতে রাখা হয়, সেখানেই গাছ গজিয়ে কোনো না-কোনো ফসল ফলে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশেই সেটি সম্ভব নয়।
তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল এবার (২০২০) হাওরের বোরো ধান মাড়াই। আল্লাহর অশেষ রহমতে সরকারি বিভিন্ন সফল ও সময়োপযোগী উদ্যোগে সেটি ভালোভাবে শতভাগ মাড়াই করা সম্ভব হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ চলছে সারাদেশের বোরো ধান সংগ্রহের।
বোরো ধান কাটার পর সেখানে কোনো গরু-ছাগল যাতে জমিতে না ঢোকে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ ধরেই নেওয়া হয়, যে জমির বোরো ধান কেটে নেওয়া হয়েছে এবং আমন ছাড়া আর কোনো ফসল এতে আবাদ করা হবে না, অর্থাত্ পতিত থাকবে, সেখানে মানুষ গোচারণভূমি বানিয়ে ফেলে। সেজন্য লাল নিশান, বাঁশের কঞ্চিসহ আগা অথবা যেকোনো ধরনের চিহ্ন দিয়ে বোঝানো—এই জমি মুড়ি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তখন আর কেউই সেটা নষ্ট করবে না। যদি সেই জমিতে ১৫ জুলাই বা তারপর আমন ধান রোপণ করা হয়, তবে ১৫ মে থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত দুই মাস সময় পাওয়া যাবে। এই দুই মাস সময় বোরো ধানের রেখে দেওয়া মুথা থেকে মুড়ি আউস উত্পাদন খুব সহজেই সম্ভব।
প্রথমে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই জমিতে বোরো ধানের রেখে দেওয়া নাড়ার গোঁড়া থেকে চারা গজিয়ে বড়ো হতে থাকবে। অতঃপর ভালোভাবে চারাগুলো গজিয়ে শেষ হলে প্রয়োজনে একটু পানি রাখতে হবে। পানি না থাকলে একটু সেচ দেওয়া যেতে পারে। সেই দুই সপ্তাহের চারা ধানের ওপর প্রতি একরে ২৫-৩০ কেজি হারে শুধু ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। আরো দুই সপ্তাহ পর থেকে শিষ বের হবে, যা আরো দুই-তিন সপ্তাহে পরিপক্ব হবে। অর্থাত্, শুরু থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে মোট সময় লাগবে সর্বোচ্চ দুই মাস। এতে একরে ২০ থেকে ২৫ মণ পর্যন্ত ধান উত্পাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে পতিত জমিতে এই ধান উত্পাদন আমাদের জাতীয় উত্পাদনকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ পদ্ধতি যে শুধু বোরো মৌসুমেই সম্ভব তা নয়; একই পদ্ধতি অনুসরণ করে আমন ধান কাটার পরেও পুনরায় বোরো আবাদ শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত মুড়ি কিংবা রিলে বা সাথি ফসল আবাদ করে মোট উত্পাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কাজেই এ কাজে আমাদের যা সুযোগ আছে তার সবটুকুই ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
