শহীদুল ইসলাম
স্নায়ুযুদ্ধ শেষে তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবেই পুরো বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। সামরিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে ন্যাটো জোটকে। অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের তথা ন্যাটো জোটের একক আগ্রাসন বিশ্ব পরিলক্ষিত করে আসছে। বিশেষত রাশিয়ায় ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের উত্থান সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খুব অল্প হলেও চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পেরেছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যখন যুক্তরাষ্ট্র অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই বাশারের পাশে এসে দাঁড়ায় পুতিন। ২০১৬ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রথমে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে জানায় রাশিয়া। ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার আর্থিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খুব বেশি চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারেনি।
কমিউনিস্ট চীন সর্বদায় সামরিক সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে আসছে। চীন বরাবরই অর্থনৈতিক দিককেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আর তার ফলাফলস্বরূপ আজকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ক্রমেই কমতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তে অনেকটাই হতবাক হতে থাকে মিত্র দেশগুলো। কোনো ঘটনা ছাড়াই মিত্র দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ নির্বাক করেছে পুরো বিশ্বকে। ন্যাটোতে মিত্র দেশগুলোর পাওনা পরিশোধের পুনঃপুন তাড়া, হুমকির মুখে ফেলেছে জোটকেই। কুর্দি ইস্যুকে কেন্দ্র করে, তুরস্কের সঙ্গে সিরিয়াতে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, সংঘাত থামানো গেলেও দেশ দুটির মধ্যে দূরত্ব কিছুটা হলেও সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্রয় করা নিয়ে তুরস্কের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণ অনেকটাই হতবাক করেছিল সদস্য দেশগুলোর। নাফটা চুক্তি বাতিল করে দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডা, মেক্সিকোর সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার, একতরফাভাবে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা, ইউনেস্কো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার ক্রমেই সারা বিশ্বব্যাপী দেশটির প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা, গ্রেট এগেইন’ স্লোগান বাস্তবায়নে শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা প্রাধান্য পেয়েছে। সারা বিশ্বব্যাপী সামাজিক, সামরিক যে সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র করত তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ফলে প্রেশার সৃষ্টিকারী গ্রুপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন করপোরেট জগতের লোক। তার কাছে বরাবরই অর্থনৈতিক লাভক্ষতি প্রাধান্য পেয়েছে। নির্বাচনের সময় অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য চীনকেই আক্রমণ করেছেন। ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ধর্ষণ করছে’—এমন কথা বলতেও বাদ রাখেননি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই তার মূল টার্গেট হয়ে ওঠে চীন। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ছিল এমন অভিযোগ ছিল প্রথম থেকেই। কোন এক অদৃশ্য কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াকে খুব বেশি আলোচনায় রাখেননি। চীনের ওপর অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করে তিনি চেয়েছিলেন চীনের আধিপত্যকে খর্ব করতে। বসে থাকেনি চীনও। যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও আরোপ করে অতিরিক্ত শুল্ক। উভয় দেশের এরকম পালটাপালটি শুল্ক আরোপ রূপ নেয় বাণিজ্যযুদ্ধে। যদিও পরবর্তীতে উভয় দেশ ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
করোনা-পরবর্তী সময়ে অস্ত্রের চেয়ে অর্থই আধিপত্যর ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখবে। আর এ ক্ষেত্রেও চীন এগিয়ে থাকবে। ‘চীনের ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ আফ্রিকা, এশিয়ায় বিপুল বিনিয়োগ, ইউরোপ আমেরিকার বিশাল বাজারে একাধিপত্য চীনকে হয়তো একক আধিপত্যর পথে এগিয়ে রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিই হয়তো চীনকে সেই সুযোগটি এনে দিচ্ছে। ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়তো আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে, ট্রাম্পের পরিবর্তে অন্য কোনো যোগ্যতম প্রেসিডেন্ট এসে যুক্তরাষ্ট্রে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করবে, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে তার হঠকারিতায় চীনকে চূড়ান্ত আধিপত্যের আসনে বসাবে। সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
