রিদওয়ান বিন ওয়ালী উল্লাহ
করোনা বা যে কোনো বিমার থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও ধর্ম কিংবা স্রষ্টাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক? বিষয়টি ভেবে দেখাটা বোধ করি খুবই যুক্তিসঙ্গত। চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্ররাজির নিজ নিজ কক্ষপথে সুশৃঙ্খল পরিভ্রমণ অংশীদারহীন একক স্রষ্টার অস্তিত্বের অকাট্য দলীল। বিশ্ব জগতের স্রষ্টা নিজেই চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রমকারী হওয়া। আর প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটে’—সুরা ইয়াসিন: ৪০। সুশৃঙ্খল-সুনিপুণ এ বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের প্রতিটি সৃষ্টি কতই না নিখুঁত! মহান আল্লাহর ভাষায়— ‘অসীম দয়ালু আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির কোথাও তুমি কোনো খুঁত দেখবে না; আবার দেখ তো, কোথাও কি তুমি কোনো রকম ফাটল দেখতে পাও? অতপর দৃষ্টি ফেরাও (নভোমণ্ডলের প্রতি), বারবার তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে’—সুরা আল মুলক-৩-৪। সুতরাং তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত।
পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে—‘আমি এ গ্রন্থে (তাদের) বর্ণনার কোনো কিছুই বাকি রাখিনি’—সুরা আল আনয়াম-৩৮। অন্যদিকে, বিজ্ঞান তো আল্লাহর সৃষ্টি মানুষেরই আবিষ্কার। তাই বিজ্ঞানও তারই সৃষ্টির অংশ হওয়া স্বাভাবিক। আল্লাহর একাত্মবাদ ও তাঁর সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনে পবিত্র কুরআনে বিজ্ঞান বিষয়ক অন্তত সাত শতাধিক (৭০০) আয়াত উদ্ধৃত রয়েছে—(বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃ.১১)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জ্ঞানগর্ভ/ বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ’-সুরা ইয়াসিন:২। উদাহরণস্বরূপ, সপ্ত আকাশ ভেদ করে স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মুহাম্মদ (স) কে আরশে নিয়ে যাওয়া মহাকাশ গবেষণায় পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের জন্য এক যুগান্তকারী নির্দেশক। পবিত্র কুরআন যে নির্ভুল ও বিজ্ঞানসম্মত সে সম্পর্কে ড. মরিস বুকাইলি বলেন, ‘কুরআনে এমন একটা বক্তব্যও নাই—যে বক্তব্যকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিচারে খণ্ডন করা যেতে পারে’ (বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান: আখতার উল আলম অনূদিত, পৃ.১২)।
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করে মুসলিম সূর্যসন্তানেরা সেই নবম-দশম শতাব্দী থেকে অষ্ট-ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিজ্ঞান জগতে রাজত্বের আসন অলংকৃত করে গেছেন।
ইবনে সীনা, আলরাজী, আবুল কাসেম জাহারাভী, ইবনুল হাইছাম, জারকালী, জাবির বিন হাইয়ান, মূসা আল খারেজমী, ইবনে নাফিসদের কালজয়ী গ্রন্থগুলো শত শত বছর ধরে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূল পাঠ্য ছিল (বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃ.১৩)। উইলিয়াম ওসলার তার ‘ইভলুশন অব মডার্ন সাইন্স’ গ্রন্থে ইবনে সীনার ‘আল কানুন ফিত-তিব’কে চিকিত্সাশাস্ত্রের বাইবেল বলে উল্লেখ করেছেন।
মানব সেবা যদি শ্রেষ্ঠ কর্ম হয়ে থাকে, যেমনি বলেছেন মুহাম্মদ (স), ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রসুল (স) এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রসুল, কোনো ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বলেন, সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে’-(তাবারানী)। তাহলে মানবকল্যাণে বিজ্ঞান চর্চা তো আরো বড়ো শ্রেষ্ঠ কর্ম। কারণ, বিজ্ঞানের মাধ্যমে চিকিত্সাসেবাসহ বিভিন্নভাবে মানবসেবার মহত্ কার্য সম্পন্ন হয়ে থাকে। রসুল (স) বলেছেন, ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। বিজ্ঞানকে কিন্তু আরবিতে ‘ইলম’ বলা হয়। তাই ‘ইলম’ শব্দের মধ্যে বিজ্ঞানও শামিল।
মানবদেহ কিংবা মানবদেহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থাকা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিজ্ঞানের সৃষ্টি নয়। মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে পয়দা করেছি’-সুরা আততীন:৪। এ মহান সত্যটি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কে রাখে? আধুনিক যুগে পৃথিবীকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অস্ত্র যে বিজ্ঞান তৈরি করতে পেরেছে, সে বিজ্ঞান মানব সন্তান দূরে থাক, মানবদেহের কোনো একটি অঙ্গ হুবহু আল্লাহর দেওয়া অঙ্গের মতো সৃষ্টি করতে কিংবা মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার মতো চ্যালেজ্ঞ গ্রহণ করতে পারেনি। অন্য দিকে মানুষ অসুস্থ হলে গবেষণার মাধ্যমে (যা বিজ্ঞানের কাজ) ওষুধ আবিষ্কার করে চিকিত্সা নেওয়ার কথাও ইসলাম শিখিয়েছে। রসুল (স) এরশাদ করেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিত্সা গ্রহণ কর কেননা আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি; শুধু বার্ধক্য রোগ ব্যতীত—আবু দাউদ: ৩৮৫৫। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) হূদরোগে আক্রান্ত হলে রসুলুল্লাহ (স) তাঁকে তখনকার প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারেস ইবনে কালদাহর নিকট যেতে নির্দেশ দিয়েছেন—আবু দাউদ: ৩৮৭৫।
তাই স্রষ্টা ও তার উপাসনার অনুষঙ্গগুলোকে বিজ্ঞানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া একেবারেই বোকামি। সুতরাং যে কোনো বিমারে স্রষ্টার অনুগ্রহের প্রয়োজনীয়তা এক মহাসত্য। তাঁর বিভিন্ন ধরনের অনুগ্রহের মধ্যে এটাও একটি মহান অনুগ্রহ যে, বিজ্ঞান মানুষের যে কোনো মুসিবতে উপযুক্ত জিনিসটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হওয়া। বর্তমান পৃথিবীর এ মহা মুসিবত ‘কোভিড-১৯’ এর প্রতিষেধকও সৃষ্টিকর্তার রহমতে বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ রসুল (স) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি—আবু দাউদ: ৩৮৫৫।
l লেখক : এম ফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
