জাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময় মাহে রমজান

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ২০:৫৩

এহসান বিন মুজাহির

 

জাকাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর জাকাত ফরজ। জাকাত আদায়ের সুনির্দিষ্ট সময় না থাকলেও অফুরন্ত পুণ্যে ভরা মাহে রমজানুল মোবারকই জাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। আল্লাহ এই রমজান মাসে তার যেকোনো ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল, ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। ইসলামি শরিয়তে জীবনযাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর পর সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা যে কোনো একটির সমমূল্যের সম্পদ কারো কাছে পূর্ণ এক বছর সঞ্চিত থাকলে নির্ধারিত সম্পদের একাংশ (শতকরা আড়াই শতাংশ) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরআনে বর্ণিত আট প্রকার খাতে ব্যয় করাকেই জাকাত বলা হয়।

কোরআন ও হাদিসে জাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনুল কারিমে সুরা বাকারার ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত দাও।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো এরশাদ করেছেন, ‘আর যারা সোনা ও রুপা সঞ্চিত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ প্রদান করুন। সেদিন ঐ সব (সোনা-রুপা) দোজখের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাটে, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। এটা তোমরা নিজেদের জন্য যা সঞ্চয় করেছিলে তার প্রতিফল। সুতরাং, যা তোমরা সঞ্চিত করেছিলে তার স্বাদ গ্রহণ করো। (সুরা তওবা :৩৪-৩৫)।

জাকাতের ফরজ :জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো ছয়টি। শর্তগুলো হচ্ছে : ১. মুসলমান হওয়া। ২. জাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া। ৩. ঋণমুক্ত হওয়া। ৪. নেসাব পরিমাণ (সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সমপরিমাণ) সম্পদের মালিক হওয়া। ৫. নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া। ৬. জাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।

জাকাতের ক্ষেত্র ও নিসাব :জাকাতক্ষেত্র অনুযায়ী জাকাত প্রদানের পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। (জাকাত কোনো ক্ষেত্রে ২.৫ ভাগ। কোনো ক্ষেত্রে ৫ ভাগ, কোনো ক্ষেত্রে ১০ ভাগ)। ফকিহগণের সর্বসম্মতিক্রমে স্বর্ণে জাকাতের নিসাব ২০ মিসকাল বা সাড়ে সাত ভরি, তথা ৮৭.৪৫ গ্রাম। এর কম হলে জাকাত দিতে হবে না। কারো কাছে ২০ মিসকাল পরিমাণ স্বর্ণ যদি এক বছর অতিক্রম করে, তবে তাতে অর্ধ মিসকাল স্বর্ণ জাকাত ওয়াজিব হবে। (নূরুল আনওয়ার, শরহে বেকায়া)। ৫২ তোলা রুপা অথবা ৭.৫০ তোলা সোনা অথবা সমপরিমাণ অর্থ। তবে গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে জাকাত আদায়ের পদ্ধতি ভিন্ন। নগদ অর্থ, সোনা-রুপা, ব্যাবসায়িক পণ্যসামগ্রী ছাড়াও মহিলাদের অলংকারের জাকাত আদায় করা ওয়াজিব। নাবালেগের সম্পদের জাকাত অভিভাবক আদায় করবেন। ব্যাবসায়িক পণ্যে জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে দোকান বা গুদামে মজুতকৃত সব পণ্যের মূল্যমান হিসাব করে জাকাত আদায় করতে হবে। শিল্পকারখানায় প্রস্তুতকৃত পণ্যসামগ্রীর ওপরও জাকাত আদায় ওয়াজিব। অবশ্য কারখানার ভূমি, বিল্ডিং, মেশিনারি, গাড়ি ইত্যাদির ওপর জাকাত ওয়াজিব নয়।

জাকাতের হকদার :কাছের আত্মীয়স্বজন যারা আর্থিকভাবে দুর্বল, তারা জাকাতের বেশি হকদার। যারা জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত  কোরআনের আলোকে তারা হচ্ছেন :নিঃস্ব, অভাবী, জাকাত সংগ্রহে নিযুক্ত কর্মী, নওমুসলিম, ঋণী, মুক্তিপ্রত্যাশী দাস-দাসী, মুজাহিদ ও মুসাফির। উপরিউক্ত আটটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাপ্যের অগ্রাধিকার হচ্ছে ফকির ও মিসকিন, অর্থাত্ সমাজের দরিদ্র শ্রেণি।

জাকাতের টাকা একজনকে অথবা খুচরা করে অনেকজনকে দেওয়া যাবে। তবে ১০০ জনকে খুচরা টাকা, শাড়ি-লুঙ্গি না দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার মতো করে ব্যবস্থা করে দিতে পারলে (যেমন একটি দুধের গাভি কিনে দিলেন, দোকান করে দিলেন, অন্য কোনো ব্যবসার পুঁজি করে দিলেন) তা দারিদ্র্যবিমোচনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সম্পর্কে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ‘উমার (রা.) বলেন, ‘যখন তোমরা দেবে তখন ধনী বানিয়ে দাও।’ পিতা-মাতা-দাদা-নানা-স্ত্রী-সন্তানদের জাকাত দেওয়া যাবে না। মসজিদ ও মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের জন্য জাকাত দেওয়া যাবে না। তবে মাদ্রাসার এতিম ও গরিব শিক্ষার্থীদের জাকাত দেওয়া যাবে।

লেখক :আলেম, সাংবাদিক ও প্রধান শিক্ষক, শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুল, মৌলভীবাজার।