‘লকডাউন’ ও ‘সোশ্যাল ডিসটেন্স’ কতটা মানছি?

আপডেট : ১৫ মে ২০২০, ২১:৫৩

নীলকণ্ঠ আইচ মজুমদার

করেনাকালে আমরা খুব বেশি পরিচিত ‘লকডাউন’ ও ‘সোস্যাল ডিসটেন্স’-এর সঙ্গে। শাব্দিক অর্থ না জেনেও ব্যবহারবিধির সঙ্গে অনেকটাই সম্পর্কযুক্ত হতে পারলেও পুরোটার সঙ্গে পরিচিত হতে পারিনি। কারণ জাতি হিসেবে আমরা অস্থির প্রকৃতির এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্ধ বিশ্বাসের প্রভাবও রয়েছে। আমরা কখনো বদ্ধ ঘরে থাকতে পারি না। আর বিশেষ করে সামাজিক বন্ধনে বসবাস করতে অভ্যস্ত জন্মগতভাবেই। ভয়ে কিংবা সরকারের কঠোরতা যা-ই বলা হোক না কেন তারপরও ঘরে থাকা অনেক কঠিন। তবে সময়ের চাহিদা বিবেচনায় কঠিন বাস্তবতায় এ বিধিনিষেধ মেনে চলা অপরিহার্য।

সময়ের স্রোতে লকডাউন অনেকটাই মলিন হয়েছে—এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের মাঝে এ দেয়াল ভাঙার যেন প্রবণতা তৈরি হয়েছে! জনগণকে বাধ্য করার মতো কোনো ম্যাজিক-শক্তিও নেই! ছোটো ছোটো রাস্তায় বা গলি ও গ্রামের প্রবেশমুখে বাঁশ দিয়ে বাধা তৈরি করা হলেও বাঁশের নিচ দিয়ে অবাধে যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় সেলুনে বাইরে থেকে নক করলে ভিতর থেকে শব্দ আসছে—দুজন আছে, চল্লিশ মিনিট পর। আবার চায়ের দোকানে নক করলে—ভিতর থেকে বলতে শোনা যায়, লাল না দুধ। এতকিছুর পরও কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেটুকু লকডাউন হয়েছিল তা আশার বাণী হয়ে উঠেছিল। বিদেশ থেকে আসার পর হোম কোয়ারেন্টিনের ব্যাপারেও তত্পরতা লক্ষ করা গেছে যথেষ্ট। যখন নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠল চীনের উহান নগরীর মতো, সেটা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমরা হারিয়ে ফেললাম। যার পরিপ্রেক্ষিতেই ঢাকা আজ পরিণত হয়েছে নিউইয়র্ক সিটির মতো। বিদেশ থেকে লোক আসার খবরের মতো আজ আমাদের দিন গুনতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা ফেরত লোকদের নিয়ে। সবজি ও মাছ পরিবহনের ট্রাকে করে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষ। তৈরি হয়েছে অদৃশ্য শত্রুর কারণে আতঙ্ক। প্রতিদিনের বাজার, ত্রাণ সহায়তা এমনকি টিসিবির পণ্য নিতে এসেও জটলা পাকিয়ে সোস্যাল ডিসটেন্সকেও যেন জালে আবদ্ধ করে ফেলেছি!

সোস্যাল ডিসটেন্স এখনো আমাদের মাঝে সে ধারণাটিই তৈরি করতে পারেনি যে, এটা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকরণ নয়—এটা হচ্ছে মূলত শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। মুখে মাস্ক পরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বসার পর এক সিগারেট চারজনে খেলে দূরত্বই বলেন আর মাস্কই বলেন কাজে আসবে কি? অন্যদিকে গ্রামের মানুষের মধ্যে এখনো সঠিক ধারণাটি তৈরি হয়নি বিষয়টা কী? মুসলিম দেশে করোনা আসবে না বা গরমকালে এর প্রবণতা কমে আসবে—এসব অবাস্তব চিন্তাভাবনা অনেকটাই কমে আসছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার ফলে। তথাপি কেন জানি বাড়ছে না সচেতনতার পরিধি!

সরকার সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সারাদেশে ৪১ লাখেরও বেশি পোশাক-শ্রমিক রয়েছে। সরকার সীমিত আকারে বললেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বিষয়টি আর সীমিত আকারে নেই। যে যার মতো করে চাকরি হারানোর ভয়ে কিংবা জীবন বাঁচানোর তাগিদে যোগ দিয়েছে কাজে। সরকার যেসব ব্যবস্থার কথা বলেছে তা মেনে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কতটুকু কাজ করা সম্ভব তাও ভেবে দেখা দরকার। বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। এসবের ভিতরেও চালিয়ে যেতে হবে আমাদের কর্মযজ্ঞ। তবে মনে রাখতে হবে যে, মানুষের জন্য অর্থনীতি। আর মানুষ টিকে থাকলে একসময় অর্থনীতি জেগে উঠবে। তাই এই লকডাউন এবং সোস্যাল ডিসটেন্স বিজ্ঞানসম্মতভাবেই মেনে চলা উচিত। সরকারের দায়িত্ববোধের পাশাপাশি জনগণকেও হতে হবে সচেতন। কেবল সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে দিলেই দিনশেষে আমরা কিন্তু রক্ষা পাব না।

ময়মনসিংহ