কৃষিই পারে অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে

আপডেট : ১৬ মে ২০২০, ২২:৪০

ফারহানা নওশিন তিতলী  

একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উল্লেখযোগ্য যে উপাদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান সে দেশের অর্থনীতি। করোনা ভাইরাসের জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সর্বোচ্চ শিল্প খাত।  অর্থনৈতিক ভারসাম্য না রাখতে পারলে দেশ ও জাতি এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশে এই অবস্থায় একমাত্র কৃষি ব্যবস্থাই পারে দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে। বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি ও কৃষক। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তি ৬০ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৮ কোটির অধিক এবং এটি বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশগুলোর একটি এবং সে সঙ্গে একটি সম্ভাবনাময় বড়ো বাজার। দেশের সম্ভাবনাময় এই বাজারের সঠিক ব্যবহারের প্রকৃত সময় এখন।

নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সরকারের অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য। মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও প্রধানতম চাহিদা হচ্ছে খাদ্য। খাবার ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবার আগে মানুষ এগিয়ে আসে খাদ্য সহায়তা নিয়ে। আগে বাঁচার ব্যবস্থা তারপর অন্যকিছু। চারিদিকে এখন শুধু অনিশ্চয়তা। এত অনিশ্চয়তার পরেও আমাদের সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে খাদ্য উত্পাদনে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল, ডাল, সবজি আছে বিধায় সরকার, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ সেগুলো প্রয়োজন মোতাবেক কিছুটা হলেও পৌঁছে দিতে পারছে। কিন্তু বিশ্বের এমন অবস্থা চলতেই থাকলে অবস্থা কি হতে পারে তা ভাবাই যায় না।

বর্তমানে আমাদের কৃষকেরা মাঠভরা সোনালি পাকা বোরো ধান ঘরে তুলতে শুরু করেছে। এবছর আমনের ফলন ভালো হয়েছে, ২ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানেরও বাম্পার ফলন আশা করছে সংশ্লিষ্টজনেরা। সঠিক সময়ে কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারছে বলেই ভাতের চাহিদা পূরণ করবে আমাদের কৃষক। মাছ-মাংস, সবজি, দুধ, ডিম ও অন্যান্য শস্য উত্পাদনে বাংলাদেশের কৃষকের সাফল্য বলে শেষ করা যাবে না। কয়েকটি কৃষিজ উত্পাদনে বিশ্বের প্রথম সারির পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর মোটামোটি সবাই আমরা ঘরে আছি। কৃষক কিন্তু রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে আছে। এই মুহূর্তে তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। যদি কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হয়, তাহলে দেশ খাদ্য সংকটে পড়বে। যত লোক করোনায় মারা যাবে তার চেয়ে বেশি লোক খাদ্যের অভাবে মারা যেতে পারে। মানুষের পেটে খাবার না থাকলে সবকিছু ভেঙে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন প্রবাহে চরম নৈরাজ্য দেখা দেবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও খাদ্য উত্পাদন সচল রাখতে হবে।

আরেকটি বিষয় সাধারণ ছুটির কারণে পণ্য পরিবহন কিছুটা সংকটের মুখে পড়েছে। তাছাড়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন জেলা লকডাউন করার প্রয়োজন হচ্ছে। এই বিরূপ পরিস্থিতিতেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে মত্স্য ও পশু খাদ্য, সার, বীজ, কীটনাশক, মত্স্য ও পল্ট্রি বীজ, কৃষি ও মত্স্য যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকের নিকট পৌঁছাতে কোনো সমস্যা যেন না হয়।

কৃষক যেন তাদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কৃষককে পরবর্তী উত্পাদনে মনোনিবেশকল্পে উত্সাহ প্রদান করতে হবে।

আমরা যারা গ্রামে বাস করি তাদের প্রত্যেকেরই উচিত তাদের জমির পরিমাণ খুব কম হলেও যতটুকু জমি আছে প্রয়োজনে জমি বর্গা নিয়ে হলেও সেখানে কিছু না কিছু আবাদ করা। পুকুরে মাছের চাষ করা ও  হাঁস-মুরগি পালন করা। আমরা যদি নিজেদের জন্য উত্পাদন করি তাহলে সেটা দিয়ে নিজের চাহিদা যেমন মিটবে তেমনি অন্যের চাহিদা পূরণে সহায়তা হবে। আমাদের আধুনিক সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছে যারা কৃষক পর্যায়ের লোক জনের ক্ষেত্রে অনেক বৈষম্য করেন। আশা করি এমন সময়ে এসে তাদের এই বিকৃত রুচিবোধ ও বিকৃত চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন হবে। সর্বোপরি একটা কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে—কৃষক বাঁচলে, মানুষ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে এবং দেশ বাঁচলে অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী  : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া