‘করোনা মোকাবেলায় মানুষের মনের ভাষা বুঝে সচেতন করতে হবে’

আপডেট : ১৭ মে ২০২০, ১২:১৮

করোনা মোকাবেলায় মানুষের মনের ভাষা বুঝে সচেতনতার কাজটি করতে হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আয়োজনে করোনা কাল ও পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে অনলাইন আলোচনা ‘বিয়োন্ড দ্যা প্যানডেমিক’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আসলে স্বাধীনচেতা জাতি। ঘরে আটকে থেকে আমরা আমাদের ফ্রিডমটাকে মিস করি। ফ্রিডমের সঙ্গে আরেকটি বিষয় আছে, আর সেটা হলো দায়িত্ব গ্রহণ। ফ্রিডম ইনজয় করলে দায়িত্ব নিতে হবে, সেটা স্কুল লেভেল থেকে শেখানো হয় না।’

মানসিকভাবে আরো সচেতন করতে এবং সরকারের গাইডলাইন ফলো করতে কী ধরণের স্ট্রাটেজি সরকার নিতে পারে এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে যখন কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনের মত শব্দ ব্যবহার করেছি, তখনো আমরা জানতাম না, বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টা বুঝতে পারছে কী না।  অনেকে বলছেন এই শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ বা ব্যাখ্যা করে মানুষকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু এদেশের অধিকাংশ মানুষত সচেতনতার মানেটাই এখনো বোঝেন না। যদি প্রান্তিক পর্যায়ের কাউকে আমি বলি-তোমাকে সচেতন হতে হবে বা আপনাকে সচেতন হতে হবে। এই কথার অর্থ কী বুঝবে তারা? কোন ব্যাপারে, কিসের সচেতনতা? আমার মনে হয় দেশের সকল স্তরের জনগণের কথা মাথায় রেখে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো উচিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘ওদের (প্রান্তিক মানুষের) ভাষা বুঝতে হবে, ওদের মনে ঢুকতে হবে, ওদের ভাষায় কথাগুলো বলতে হবে।’

দেশের সকলের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ‘ভায়োলেন্সের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর এতে শিশুরা দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত যে সব শিশুরা বুঝতে পারে, বাহিরে নিজের মত ঘুরে বেড়াতে পারে তারা এখন বাহিরে যেতে পারছে না। ঘরে থেকে তারা এই ভায়োলেন্স দেখছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এটি হচ্ছে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক স্বাস্থ্য যখন কোন জাতির ভালো থাকে, সেই জাতি তখন সুন্দর জাতি হতে পারে।’

অনলাইন আলোচনায় উপস্থিত তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সরকার তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সঠিক তথ্য সময়মত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে।’ তথ্যমন্ত্রী জানান, শুরু থেকেই রেডিও, টেলিভিশন এবং খবরের কাগজের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা প্রদান করা হয়েছে।

দেশের সকল ডাক্তার, সেলিব্রিটি, অভিনেতা এবং অভিনেত্রীদের সেই কাজে সংযুক্ত করে প্রচারণা চালানো হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রাদুর্ভাবের আগেই আমরা প্রচারণা শুরু করেছি।’

বাংলাদেশ সরকারের এই প্রচারণা কাজে লেগেছে জানিয়ে সাংবাদিক ফারজানা রূপা বলেন, ‘সরকারের এই ক্যাম্পেইন কাজ করেছে। না হলে কোটি কোটি মানুষকে আমরা ঘরে রাখতে পারতাম না।’

এদিকে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জানান, তথ্যের উৎস ঠিক না থাকলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ও গুজব তৈরি করা সহজ হয়। গত ২০ মার্চ করোনা.জিওভি.বিডি নামক ওয়েবসাইটটি চালুর পর থেকে প্রায় ৬০ দিনে ৮৫ লক্ষের বেশি ভিজিট করেন। ‘৩৩৩’ নম্বরের মাধ্যমে এ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্যের জন্য আমরা ৭৪ লাখ ফোন কল পেয়েছি। 

তিনি বলেন, ‘৭৮ জনের বেশি ডাক্তারের কাছ থেকে বিদেশে থাকা বাংলাদেশের ১ হাজার ৭০০ এর বেশি মানুষ সেবা নিয়েছে। প্রায় ২ লাখ মানুষ করোনা বিডি অ্যাপস ডাউনলোড করেছেন। যদি বিগত ১১ বছরে এই ডিজিটাল কাঠামো তৈরি না থাকতো তাহলে এত দ্রুত মোবাইল ফিনেন্স সেবাগুলোকে চালু করা সম্ভব হতো না। ই-কমার্সে নিত্য পণ্য, মেডিসিন সেবায় ওষুধ বা খাদ্য অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কেনা যেত না। ৭০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ। আমরা যতটা করি, ততটা বলতে পারিনা। এবারও আমরা যতটুকু করছি কাজ, তার অনেকটাই আমরা এখনো সকলকে জানাতে পারিনি।

আরো পড়ুন: এপ্রিলের বেতন হয়নি ৫ হাজার কারখানায়

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, মহামারিতে আইন প্রয়োগের বিষয়টি তাদের কাছে নতুন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কাজে সফল হয়েছেন তারা।

হাসপাতালের দরজা থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত এমনকি ত্রাণ বিতরণের মতো কাজও পুলিশকে করতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুজিববর্ষে পুলিশের শপথ ছিল ‘একটি জনমুখী পুলিশ’। সেই শপথ রাখতে এই মহামারি আমাদের সহায়তা করেছে। দুই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৭ পুলিশ সদস্য করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।’

মনিরুল বলেন, ‘ভাইরাসটির সংক্রমণের প্রথম দিকে এটি সম্পূর্ণ নতুন ছিল। এখন আমাদের কাছে এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) রয়েছে। সম্প্রতি ইন্টারপোলও এসওপি অনুমোদন দিয়েছে। এসময় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজকে ঘরে রাখতে বাধ্য করার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন তিনি।’ 

তিনি বলেন, ‘ওই সব তরুণরা মনে করেন যে করোনা তাদের আক্রান্ত করতে পারবে না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রের লাইন ডিরেক্টর ডা. শাহনিলা ফেরদৌসি বলেন, ‘হাসপাতাল ছাড়া বাহিরের কাউকে পিপিই পরার কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলছে বলে আমরা দেখিনি। তারপরও হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সার্ভিসগুলোতে দেওয়া হচ্ছে। সচেতনতা তৈরিতে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত তথ্যগুলো পৌঁছে দিতে আমরা চেষ্টা করছি।’

গাউসুল আজম বলেন, ‘কথাগুলো কঠিন করে না বলে, বলা উচিত ছিলো ৩ ফুট দূরে থাকেন বা তিন হাত দূরে থাকুন। গ্রামের মানুষের জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে। শুরুতে যেই কনফিউশন তৈরি হয়েছে তা থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনি। আসছে ঈদের ছুটিতে করোনা কোথাও যাবে না, এই দেশেই থাকবে। সুতরাং আপনার রেসপনসিবিলিটি কী হতে হবে। আমরা জন সচেতনতা তৈরিতে শিল্পীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এরইমধ্যে আমরা একটি গান করেছি সম্মিলিতভাবে।’

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনার ভূমিকায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ।

 

ইত্তেফাক/এএএম