শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
এক অদৃশ্য করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে আজ গোটা বিশ্ব স্তব্ধ, অচল অর্থনীতির চাকা। বিশ্বের এমন সংকটের দিনে মানবিকতার প্রকাশ যেমন ঘটছে, তেমনি রয়েছে অমানবিকতার উদাহরণ। একবিংশ শতাব্দীর এমন ভয়াবহ সংকটকালেও অস্ত্রের ঝনঝনানি ও বোমা বিস্ফোরণে বারবার কেঁপে উঠছে বিশ্ব। যুদ্ধবাজ পৃথিবীকে বিন্দুমাত্র ছুঁতে পারেনি মানবিকতার আবেদন।
করোনায় মহামারিতে বিপর্যস্ত ইতালিতে যখন কিউবা মেডিক্যাল সরঞ্জাম ও চিকিত্সক দল পাঠায় তখন বিশ্ব হাততালি দিয়েছে একটি মানবিক পৃথিবীর জন্য। ভেনিজুয়েলা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সম্পর্কের দেশ কলম্বিয়াকে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর সার্ক সংস্থার নেতারা বৈঠকে বসেছেন মহামারি মোকাবিলায়। চীন-জাপান বৈরিতা ভুলে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু তার বিপরীতে কঠিন চিত্র রয়েছে পৃথিবীর বুকে। করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি অমুসলিম প্রধান দেশে মারাত্মকভাবে বেড়েছে ইসলামোফোবিয়া। দখলদার ইসরাইলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধ বিরতির নাটক করেও বিপর্যস্ত ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রেখেছে সৌদি জোট। শক্তিধর দেশসমূহ মানবিকতার বদলে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের খেলাকেই এগিয়ে রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনেও চলছে যুদ্ধ। লিবিয়ায় বিদ্রোহী খলিফা হাফতাব সম্প্রতি জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে সরকার গঠন করেছে। তার সাম্প্রতিক হামলা থেকে রক্ষা পায়নি কোভিড-১৯ রোগীর হাসপাতালও। স্মরণকালের বৃহত্ মানবিক বিপর্যয়ের দেশ ইয়েমেনের ৮০ ভাগ মানুষ ক্ষুধায় আক্রান্ত। সৌদি জোটের হামলা ও অবরোধে কোনো আন্তর্জাতিক ত্রাণ ঢুকতে পারে না। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ইয়েমেনের ৫০ শতাংশ হাসপাতাল সৌদি জোটের হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে রিক্ত ইয়েমেনের কোভিড-১৯ মোকাবিলার প্রস্তুতি শূন্য। কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পরও এমন ভয়াবহ মহামারির দিনে ইয়েমেনে উপর্যুপরি হামলা অব্যাহত রেখেছে সৌদি জোট। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলমনার খবর, ইয়েমেনি সামরিক বাহিনী মুখপাত্র বলছে গত সপ্তাহে ইয়েমেনে ২০০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি জোট।
আফগানিস্তানে ব্যর্থ হয়ে মার্কিনিরা তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে কেটে পড়তে চাইছে। কিন্তু আলোচনা প্রক্রিয়ায় আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। ফলে আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে সংঘাত রয়ে গেছে। আফগানিস্তানে ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ও মৃতের সংখ্যা শতাধিক পার হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফিরোজ উদ্দীনসহ প্রেসিডেন্ট প্যালেসের ২০ কর্মকর্তা। এমন দুর্দিনও আফগান সরকার ও তালেবানকে হামলা পালটা হামলা থেকে সরাতে পারেনি। ১১ এপ্রিল আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলায় ২৭ তালেবান সেনা নিহত হয়। তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ এই হামলা যুদ্ধাপরাধ বলে দাবি করেন। কিন্তু হামলার প্রতিশোধ নিতে ২১ এপ্রিল ঠিকই তিন জায়গায় পালটা হামলা করে তালেবান। এসব হামলায় ৯ বেসামরিক লোকসহ ২৩ নিরাপত্তা বাহিনীর সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।
হাসপাতালে হাসপাতালে অসহায় মৃত্যুর সারি। এমন সময় মানুষের জীবনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার কথা। কিন্তু বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ থামেনি। বিশ্ব শক্তিধরদের ভূ-রাজনৈতিক খেলা থামেনি। ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও পরবর্তীকালে সরবরাহ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পুরা বিশ্ব একমত হলেও তাতে অংশ নিতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। আবার যেসব ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে সেখানেও তোলা হচ্ছে নানা রাজনৈতিক বিতর্ক। এসব রাজনীতিতে মানুষের জীবন নয় বরং পরাশক্তিধর দেশগুলোর স্বার্থ হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব চিত্র আসলে অনৈক্য ও স্বার্থপর অসম একটি বিশ্বের চিত্রই প্রকাশ করে।
লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
