সূর্য নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের যেইভাবে আলো দান করিয়া থাকে, তাহাতে কোনো বিচ্যুতি ঘটিলে মনে ভয় জাগিতে পারে বটে। সময়টা তো ভালো যাইতেছে না। করোনা ভাইরাস যে এইভাবে সারা পৃথিবীকে নাকানি-চুবানি খাওয়াইবে, মাত্র কিছুকাল আগেও কেহ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করিতে পারিয়াছিল? করোনার এই লকডাউনের সময় সূর্যও নাকি লকডাউনে যাইতেছে! এমন ভয়ংকর কথা শুনাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক পোস্ট, যুক্তরাজ্যের দ্য সান, ভারতের এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টাইমস প্রভৃতি সংবাদমাধ্যম। নাসার বরাত দিয়া বলা হইতেছে, সূর্যের দহন অবস্থান এখন সর্বনিম্ন, যাহাকে বলা হয় ‘সোলার মিনিমাম’। ইহার অর্থ হইল, সূর্যপৃষ্ঠের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ হ্রাস পাইতেছে। তাহাতে সূর্যের শরীরে সৌর কলঙ্কের চিহ্নও হ্রাস পাইতেছে। এমনকি সূর্যের এই লকডাউনে যাওয়ার ঘটনাটি ‘ডাল্টন মিনিমাম’-এর পুনরাবৃত্তি হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। ১৭৯০ ও ১৮৩০-এর মধ্যে সূর্যের মিনিমাম সোলারের কারণে তীব্র শীতের মুখে পড়িয়াছিল পৃথিবী। দেখা দিয়াছিল বিভিন্ন প্রাকৃতিক সমস্যাও। ঐ সময় ২০ বত্সরেরও বেশি সময় ধরিয়া এই সমস্যা বিদ্যমান ছিল। বিপর্যয় নামিয়াছিল খাদ্য উত্পাদন-ব্যবস্থাতেও। ইহার মধ্যে ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার তামবোরা পর্বতশৃঙ্গে ২ হাজার বত্সরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্ন্যুত্পাতের ঘটনা ঘটিয়াছিল। সেই অগ্নুত্পাতে অন্তত ৭১ হাজার মানুষের প্রাণহানি হইয়াছিল। পরের বত্সর বিশ্বের অনেক দেশে গ্রীষ্মকালই দেখা যায় নাই। এমনকি জুলাইয়ের গরমের দিনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তুষারপাত হইয়াছিল!
সকল কলঙ্ক সকল সময় খারাপ নহে এবং কলঙ্ক হ্রাস পাইলে যে আমাদের সমূহ বিপদ ঘটিতে পারে, তাহার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত সৌর কলঙ্ক। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের গ্রহে যেমন নানা ঋতু রহিয়াছে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষার মতো আর সেইগুলি ঘুরিয়া-ফিরিয়া আসে নির্দিষ্ট সময়ের অন্তরে, সূর্যের পিঠেও ঠিক তেমনই বিশেষ একটি সময় ধরিয়া একের পর এক সৌর কলঙ্কের জন্ম হয়। তাহার পর একটা নির্দিষ্ট সময় ধরিয়া তা বাড়িতে বাড়িতে হইয়া উঠে সর্বাধিক। একইভাবে উহা হ্রাস পাইতে পাইতে একেবারেই নগণ্য হইয়া যায়। সূর্যের পিঠে সৌর কলঙ্কের জন্ম হওয়া হইতে শুরু করিয়া তাহাদের সংখ্যাটা সর্বাধিক হইবার সময়টা যেমন পাঁচ-ছয় সময় লাগে, তেমনই সেই সর্বাধিক সংখ্যার সৌর কলঙ্কগুলি কমিতে কমিতে নগণ্য হইয়া যাইতেও একই সময় লাগে।
তবে কিছু কিছু সংবাদপত্র ‘সোলার মিনিমাম’কে বহু ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত করিয়া প্রকাশ করিয়াছে। ইহাকে কেয়ামতের সহিতও তুলনা করা হইয়াছে অনেক জায়গায়। ইহা ঠিক নহে। প্রাকৃতিক চক্র এই বিশ্বের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। হয়তো সকল সময় সেই চক্র আমাদের জন্য শুভ হয় না। কিন্তু এই সকল প্রাকৃতিক চক্রের ভিতর দিয়াই এই পৃথিবী কোটি কোটি বত্সর ধরিয়া টিকিয়া রহিয়াছে। তবে আশঙ্কা অনুযায়ী সোলার মিনিমামের জন্য দুই শত বত্সর আগে যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা এইবারও ঘটিলে উহা আমাদের জন্য সাময়িকভাবে নূতন কিছু সমস্যা সৃষ্টি করিতে পারে। এই জন্য বিষয়টি আগে হইতেই আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত।
