সিকদার আনোয়ার
করোনার কারণে পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্র ও মাত্রা অস্বাভাবিক রকম স্থবির হয়ে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী মহামন্দার পূর্বাভাস প্রতিধ্বনিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে স্ব স্ব অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়ে দিশেহারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে জাতীয়তাবাদ ধারণা আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই মধ্যে তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তেল উত্পাদনকারী দেশসমূহসহ অধিকাংশ দেশ তাদের দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে শুরু করেছে। করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে প্রত্যাবর্তনের পর কর্মসংস্থান, খাদ্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি গত এপ্রিল হতে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। শ্রমঘন এ শিল্প খাত সংকুচিত হতে যাচ্ছে। যার কারণে কর্মক্ষম এক বিশাল জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়বে। অনেকটা নিরুপায় হয়ে এরই মধ্যে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ (৮৪%) পোশাক খাত যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই সঙ্গে প্রবাসীদের প্রত্যাবর্তন ত্বরান্বিত হয় তবে ১৮ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠীর বাঁচার প্রধান অবলম্বন হবে কৃষি।
আশার কথা, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। ধান উত্পাদনে ইন্দোনেশিয়াকে টপকিয়ে তৃতীয় স্থানে আমাদের অবস্থান হয়েছে। তদুপরি কৃষির ওপর বাড়তি এ চাপ সামলানোর লক্ষ্যে আগামী আউশ ও আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি শ্রমিকের স্বল্পতা এবং মজুরি বৃদ্ধি, আহরিত ফসলের সময়ভিত্তিক যথাযথ দাম না পাওয়া, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের যথাযথ সুবিধা না থাকার কারণে কৃষি একটি অলাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিসহ দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রসারের কারণে অনেক এলাকায় কৃষিজমি চাষাবাদ না করে পতিত রেখে দেওয়া হচ্ছে। কৃষিকে লাভজনক পেশায় পরিণত করতে না পারলে পতিত কৃষিজমির পরিমাণ বাড়তে থাকবে। এরই মধ্যে ব্যাপক কৃষিজমি ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হয়েছে। আগামী ২০৫০ সালের সম্ভাব্য ২৫ কোটি জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে এখনই ইউনিয়নভিত্তিক ডিজিটাল রেকর্ডিং করে তা নিয়মিত পরিবীক্ষণ করতে হবে যাতে কৃষিজমি অক্ষুণ্ন থাকে।
বর্তমান সরকার কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য কৃষি উত্পকরণে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানপূর্বক সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষায় সচেষ্ট রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে সরকারি নীতি ও সহযোগিতার কারণে মত্স্য ও পোলট্রি উত্পাদনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এরই মধ্যে বিপ্লব ঘটেছে। এছাড়া দেশ মাংস উত্পাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে। কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের জন্য কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টরসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে, যা কৃষিকে স্বাবলম্বী করতে সহায়তা করবে। সেই সঙ্গে মূল্য সহায়তা প্রদানের জন্য সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ হতে সরাসরি ধান ক্রয়ের পরিমাণ ও মণ সরকার পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়িয়েছে। অপরদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত ক্ষমতা ২০ লাখ টন হতে ২৬ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ প্রচেষ্টাকে আরো বেগবান করতে হবে যাতে কৃষির সব ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতা হ্রাস করে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যায়।
কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি খাতে প্রণোদনা বহুলাংশে বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষি উত্পাদনে শ্রমিকের মজুরিতে উত্পাদন খরচের একটি বড়ো অংশ চলে যায়। এটি কমিয়ে আনতে না পারলে কৃষিকে লাভজনক করা সম্ভব হবে না এবং কর্মক্ষম শিক্ষিত বেকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কৃষিকাজে উত্সাহিত হবে না। সেজন্য সরকারের ২০১৮ সালের কৃষিনীতি অনুযায়ী কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। জমির ধান কর্তনে সরকারি প্রণোদনায় কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর ও রিপার মেশিন ক্রয়ে কৃষকদের মূল্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ৫%-১০% জমির ধান এ সব হার্ভেস্টরের মাধ্যমে কর্তন করা হচ্ছে। এটিকে ৮০%-এর ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হলে এ খাতে সরকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। কম্বাইন্ড হার্ভেস্টরের মাধ্যমে ধান কর্তন, মাড়াই ও বাছাই করলে প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। অপরদিকে কর্তনোত্তর ক্ষতিও এতে কমে যাবে অর্থাত্ শস্যের অপচয় কম হবে এবং আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলহানি হতেও ফসলকে রক্ষা করা যাবে।
পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে দেশের প্রায় সব জমি চাষের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাওয়ার টিলারের সঙ্গে ট্রাকটরের প্রচলন করা হলে উত্পাদন খরচ কমে যাবে, সময় বাঁচবে এবং সব জমি যথাসময়ে চাষের আওতায় আসবে। ট্রাকটরের ব্যবহার প্রাথমিকভাবে হাওর ও বিল অঞ্চলে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এর প্রচলন করতে হবে। এ কাজটি সরকারি ব্যবস্থাপনা অথবা সরকারি-বেসরকারি (‰O-N‰O) যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
বিশ্বে মোট চালের ৮১ শতাংশ উত্পাদিত হয় এশিয়ার সাতটি দেশ-চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারে। জনসংখার আধিক্য এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে এশিয়ার দেশগুলোর চাল বাজ্যের সুযোগ কম। উন্নয়নশীল দেশগুলো চাল আমদানি করে ৪০.৮ মি. টন এবং উন্নত দেশগুলো আমদানি করে মাত্র ৫.৯ মি. টন। তবে চালের চাহিদা বিশ্বব্যাপী ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তাই রপ্তানির জন্য উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত। বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলহানি ঘটলে আমাদের বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়। কিন্তু, বিশ্বব্যাপী চালের জোগান সীমাবদ্ধ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তখন দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং যথাসময়ে আমদানি করাও সম্ভব হয় না। তাই চালের উত্পাদন এবং মজুত টেকসই করার জন্য এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ ও প্রণোদনার মাত্রা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব বাজারে গমের উত্পাদন এবং রপ্তানি যোগ্য উদ্বৃত্ত পর্যাপ্ত বিধায় এর মূল্যও চালের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। সেই সঙ্গে, গমের সংরক্ষণ ও মজুত ব্যবস্থাপনা চালের তুলনায় সহজতর ও দীর্ঘস্থায়ী। মূলত আবহাওয়া অনুকূল না হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক সম্পর্কসহ ভূ-রাজনীতির বিবেচনায় খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো গম আমদানি করে নিরাপদ মজুত গড়ে তোলা যেতে পারে।
সরকার কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য উপকরণ সহায়তা এবং উত্পাদিত ফসল (চাল, গম) ক্রয় করে মূল্য সহায়তার মাধ্যমে কৃষি খাতে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। কৃষি উপকরণে সরকারি সহায়তায় প্রায় সব কৃষক উপকৃত হলেও নানাবিধ কারণে মূল্য সহায়তার মাধ্যমে সব কৃষককে উপকৃত করা সম্ভব হয় না। তাই কৃষি উপকরণে সরকারি প্রণোদনা যতই বাড়বে ততই কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ ও টেকসই হবে।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাপনায় ধান ও ভুট্টা উত্পাদন প্রাধান্য পাওয়ার কারণে ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার উত্পাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম উত্পাদিত হয়। তাই ডাল ও মসলার চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত এবং রপ্তানিকারক দেশ কোনো কারণে রপ্তানি বন্ধ করলে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। তাই এসব ডাল ও মসলা উত্পাদনে কৃষকদের স্বল্পমূল্যে উন্নত বীজ ও চারা বিতরণ করে প্রণোদনা দিতে হবে।
আসন্ন বিশ্বমন্দায় কর্মহীন জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কৃষি ও কৃষিই হতে পারে আগামীর রক্ষাকবজ। আর সেজন্য এ খাতের যথাযথ মূল্যায়ন, ব্যাপক ও বহুমুখী প্রণোদনা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। সেই সঙ্গে, কৃষি জমি রক্ষা ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে অঞ্চলভিত্তিক জমির ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশের চাহিদা অনুযায়ী চাল, গম, ডাল ও মসলা উত্পাদন নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক :সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব
