যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন কেমন আছে?

আপডেট : ১৮ মে ২০২০, ২১:৩৯

মো. জাফর আলী

নব্বইয়ের দশক থেকে এ পর্যন্ত ধাপে ধাপে সংঘটিত কয়েক দফা গৃহযুদ্ধ, ক্ষমতার চেয়ার নিয়ে রাজনৈতিক রেষারেষি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, চরম দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অবরোধসহ চরম মানবিক বিপর্যয়ের ভুক্তভোগী যেন ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ।

আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের গরিব এই দেশ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তন ও প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ। বাব এল মান্দেব প্রণালি হলো রেড সি এবং গালফ অব এডেনের সংযোগস্থল, যেটির পাশেই ইয়েমেনের অবস্থান। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের সরবরাহ এই রুট দিয়ে হওয়ার কারণে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময় প্রাচীন সভ্যতার অধিকারীও ছিল এদেশ। কিন্তু ১ হাজারেরও বেশি সময় ধরে এটি অবহেলিত দেশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এ দেশের অর্ধেকেরও বেশি স্থান বসবাসের অযোগ্য। ১৫১৭ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বারা শাসিত হয়েছে  ইয়েমেন। শিয়া অধ্যুষিত উত্তর ইয়েমেন ও সুন্নি অধ্যুষিত দক্ষিণ ইয়েমেন ১৯৯০ সালে একত্রিত হওয়ার পর, ১৯৯৪ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধে। আবার ২০০৪ সালেও গৃহযুদ্ধ হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে খনিজ তেলের আবিষ্কার ইয়েমেনকে উন্নয়নের হাতছানি দেখিয়েছে, যার কারণে গৃহযুদ্ধসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কোন্দল, আরব-বসন্তের পূর্ব পর্যন্ত এর অর্থনীতিকে একেবারে ভঙ্গুর করতে পারেনি।

২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া আরব বসন্তের আগুন যেন পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তিউনিসিয়া, মিশর, সিরিয়া, বাহরাইন, সোমালিয়া, ইরাক, ইরান, জর্ডান, কুয়েত, ওমানসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ এই আগুনের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বকেও এই আগুনে ঘি ঢালতে দেখা গিয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বেশ পরিবর্তন এসেছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবার এখনো পর্যন্ত কোনো কোনো দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইয়েমেনেও একধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে আজও তা চলমান।

২০১১ সালে বহুদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহকে তার ডেপুটি আবদারাবুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হলে নতুন হিসেবে প্রেসিডেন্ট হাদিকে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও খাদ্যের সংকট, আল-কায়েদার হামলা, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, আব্দুল্লাহ সালেহর প্রতি সামরিক কর্মকর্তার আনুগত্যের মতো বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

পার্সটুডের সংবাদ অনুযায়ী, অধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক একটি গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে ইয়েমেন যুদ্ধে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৯ হাজার ৬৮২ জন পুরুষ, ২ হাজার ৪৬২ জন নারী ও ৩ হাজার ৯৩১ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া সরাসরি আহত হয়েছে ২৫ হাজার ৪০০ জন, যার মধ্যে ৪ হাজার ২০০ শিশু, ৩ হাজারেরও বেশি নারী এবং ১৮ হাজার ১০০ জনেরও বেশি পুরুষ রয়েছে। কয়েকটি গবেষণা মোতাবেক, সৌদি জোটের সরাসরি হামলা ছাড়াও ক্ষুধা ও বিভিন্ন রোগে মারা যাওয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিহতের সংখ্যা ১ লাখেরও বেশি। খাদ্য ও ওষুধ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরে প্রায় ৫০ হাজার শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেনে ২ কোটি ২ লাখ মানুষের জন্য ত্রাণ সাহায্যের প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে জীবন যাপন করছে।

বর্তমানে পৃথিবীর করোনা পরিস্থিতির প্রভাবটাও কিন্তু ইয়েমেনে অনেকটা পড়েছে। ইতিমধ্যে শতাধিক লোক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় সৌদি জোট ৯ এপ্রিল এ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেও করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ইয়েমেনে অন্তত ২৬২ বার স্থল ও বিমান হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধপীড়িত ও দারিদ্র্যপীড়িত ইয়েমেন যখন প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, ঠিক তখনই মে মাসের শুরুতেই সে দেশের খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি পণ্যবাহী ১১টি ট্রাকে হামলা চালিয়েছে প্রতিপক্ষ এ জোট। এই সংকটের মধ্যেই আবার সৌদি আরব, ইয়েমেনের হাসপাতালে হামলা ও যুদ্ধবিমান থেকে বিভিন্ন স্থানে ভাইরাস সংক্রমিত মাস্ক ফেলার মত ঘৃণিত  কাজও করেছে।

সারা বিশ্বের উন্নত ও শক্তিশালী দেশগুলো যেখানে করোনা পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে, এমন মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেও ইয়েমেনে এতবার হামলা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দেওয়ার মতো। এভাবে কিছুদিন চলতে থাকলে পৃথিবীকে ইয়েমেনের বুকে বড়ো বড়ো লাশের পাহাড় দেখতে হবে। ইয়েমেনের এই সংকট নিরসনে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে সর্বাগ্রে সৌদি জোট, হুথি ও তাদের মদতদাতা ইরানের নরম হওয়ার পাশাপাশি, দল-মত ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে এবং বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, আপস-মীমাংসা, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও  হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি সুদৃঢ় শান্তির পথ তৈরি করতে হবে, যাতে যুদ্ধবিগ্রহ নিঃশেষ হয়ে যায় এবং মানবতা মুক্তি পায়। যাতে ইয়েমেনের মানুষ অন্তত না খেয়ে মরা থেকে রেহাই পায় এবং ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে একটুখানি বাঁচার সুযোগ পায়।

লেখক :শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়