ঈদ সামনে রাখিয়া সরকার জনগণকে যার যার অবস্থানে থাকিবার নির্দেশনা দিয়াছিল। কিন্তু অগণিত মানুষ ছুটিয়াছিল বাড়ির পথে। রাস্তায় ভিড়, ফেরিতে ভিড়—গাদাগাদি করিয়া যাহার যাহার আপনজনের নিকট ছুটিয়া যাইতে চেষ্টা করিয়াছে। আমরা মানুষের আবেগ বুঝি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটিও বিবেচনায় নেওয়া একান্ত প্রয়োজন ছিল। সরকার যে আদেশ দিয়াছিল তাহা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যই। তথাপি বহু লোক বাড়ি চলিয়াও গিয়াছে। ইতিমধ্যে লকডাউন সামান্য শিথিল করায় দূরপাল্লার যানবাহন না চলা সত্ত্বেও বাড়ি ফিরিবার সিদ্ধান্ত নেয় অনেকেই। এই পরিস্থিতি দেখিয়া এক পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন কঠোর হইয়া উঠিয়াছে মানুষকে তাহার অবস্থানে ধরিয়া রাখিতে। পুলিশের মহা পরিচালক বেনজির আহমেদ ১৯ মে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জনগণের উদ্দেশে বলিয়াছেন, ‘ফিরিয়া আসুন, প্রয়োজনে পুলিশ আপনাদের ফিরার ব্যবস্থা করিবে। কিন্তু তাহাতেও কর্ণপাত করিল না কেহ। ভাড়া করা মোটরবাইকে, চড়া পয়সা খরচ করিয়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসে চাপিয়া চলিয়া গেল ঘাটে। ফলে বেরসিক পুলিশ কঠোর হওয়ায় চরম বিপাকেও পড়িলেন কিছু মানুষ। বহু মেহনত করিয়া মাওয়া ঘাট, পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছাইয়াও আবার ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছেন অনেকে। এমন ঘটনাও দেখা গিয়াছে যে ফেরি ছাড়িয়া অন্য পারে প্রায় পৌঁছাইবার মুখে সেই ফেরি ঘাটে ভিড়িতে না দিয়া ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
ইহা লইয়া কয়েকটি প্রশ্ন চলিয়া আসিতে পারে : প্রথমত পুলিশ প্রশাসনের তিন চারটি জুরিসডিকশন পার হইয়া তাহারা বাড়ির পথে গেলেন কী করিয়া? ঢাকা হইতে বাহির হইবার ও ভেতরে প্রবেশ করিবার মুখেও ছিল পুলিশ। দ্বিতীয়ত, বাড়ি ফিরা মানুষদের ফিরিতে নিষেধ করিয়াছে সরকার। সেই সরকারের ফেরি কী করিয়া হাজার হাজার মানুষকে পারাপারে সহায়তা করিল? ঐ সকল রুটে কি ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখা হইয়াছিল? নাহ্! তাহা হইলে ফেরি মানুষ লইয়া যাত্রা করিল কী করিয়া? তদন্ত করিয়া দেখিবার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয়।
নির্দেশ হইল নির্দেশ। একটি দেশের নাগরিকদের আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ করা কর্তব্য। তাহা বিচার বিভাগীয় আদেশ হউক অথবা নির্বাহী আদেশ হউক। নির্বাহী আদেশ সরকার সাধারণত দিয়া থাকে জনস্বার্থে। এই জনস্বার্থ বিষয়টি বুঝিবার দায়িত্ব সকল নাগরিকের। তাই আদেশ অমান্য করিবার প্রবণতাকে সমর্থন দেওয়া যায় না। বিশেষ করিয়া কোভিড-১৯-এর বাস্তবতা বুঝিবার ক্ষেত্রে। এইভাবে মানুষ ঈদ উদ্যাপন করিতে ঘরে ফিরিয়া গেলে গ্রামবাংলার কোথাও আর করোনা ভাইরাস মুক্ত থাকিবে না। এই বোধটি প্রতিটি মানুষের উপলব্ধির প্রয়োজন ছিল। যাহারা ঘরমুখী হইয়াছেন, তাহারাও যে খুব সুখে, আনন্দের সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের মতো ঈদ উদ্যাপন করিতে পারিবেন তাহা মনে হয় না। যাহারা বাড়ি গিয়াছেন তাহাদের যে কাহারো বাড়িতে গিয়া পুলিশ লাল পতাকা টাঙাইয়া দিতে পারে। দেশ প্রায় অচল করিয়া সরকারকে ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত করিতে হইয়াছে। ইহা তো আর শখের বশে নহে। এই কথা বুঝার জন্য নাগরিক হিসাবে আমাদের আরো পরিণত চিন্তা করিতে হইবে।
