ইতালিফেরত ও তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে চিহ্নিতের মধ্য দিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান মেলে। মার্চ মাসের ৮ তারিখে শুরু সেই একক সংখ্যা এখন ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে এ সংখ্যা। বাড়ছে মৃতের হারও। শুরু হয়েছে সামাজিক সংক্রমণ। এই সামাজিক সংক্রমণের মধ্যেই গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। বাদ যায়নি বিপণিবিতানগুলো। কেনাকাটা করতে মার্কেটগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। আবার ঈদ উদ্যাপনের জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে রাজধানী ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন মানুষ।
সামাজিক সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে যেভাবে পথে-ঘাটে ও বাজারে মানুষ চলাফেরা করছে তাতে আগামীর দিনগুলোতে আমাদের সামনে কি অপেক্ষা করছে সেটা নিয়েই চিন্তিত অনেকেই।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু আপনি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখুন কয়জন সেই নির্দেশনা মেনে চলছেন। সর্বত্রই যেন উপেক্ষিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। পথে-ঘাটে ও বাজারে মানুষ ভিড় করছে, অথচ সামাজিক ও শারীরিক দূরত্বের বালাই নাই। যেন মহামারি করোনাকে পাত্তা না দেওয়ার মানসিকতা অনেকটা আমাদের মাঝে ভর করেছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের ৭০ দিন পার হয়েছে। আমি মনে করি আমরা পিক টাইমের দিকে যাচ্ছি। দিনে শনাক্তের হার কমতে শুরু করলে বলতে পারব যে পিকে (সংক্রমণের চূড়ায়) পৌঁছে গেছি। কিন্তু এখনো সংক্রমণ বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক ও ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ঈদে শহর ছেড়ে যারা গ্রামে যাচ্ছেন তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলেন তাহলে তারা গ্রামের মানুষকে করোনায় সংক্রমিত করবেন। আবার ছুটি শেষে শহরে ফিরে নগরবাসীকে সংক্রমিত করবেন। এভাবে চললে সামনে কি ভয়ংকর পরিস্থিতি দাঁড়াবে সেটা সহজেই অনুমেয়। তিনি বলেন, যখন সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয় তখন এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবে যদি কোনো প্রয়োজনে যেতে হয় তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মনে চলার কোনো বিকল্প নাই। ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, বেঁচে থাকলে সামনে যে ঈদ আসবে তা সকলে মিলে উদ্যাপন করা যাবে। তাই ঈদের কেনাকাটা না করে ঐ টাকা দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোনো পরিকল্পনা করে মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তারা ঈদ উদ্যাপনের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে গাদাগাদি করে নদী পার হয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। এতে করে আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। কারণ করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার যখন বাড়ছে তখন সেটা কখন নিম্নগতিতে আসবে তা কেউ বলতে পারবে না। তিনি বলেন, ঘরে না থেকে কারণে-অকারণে বাইরে যাওয়ার যে মানসিকতা তাতে সামনে প্রচুর সংখ্যক লোক আক্রান্ত হবেন। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। আবার অনেকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হবে। তাই এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর হার কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা যাচ্ছে না।
বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বলছেন, একদিকে টানা ছুটি ও লকডাউনে দেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায়। অনেক খাতের শ্রমিকরা হয়ে পড়ছেন কর্মহীন। এমন পরিস্থিতিতে করোনার ভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ শুরুর পরেও বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এমতাবস্থায় আগামীর দিনগুলোতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির হার কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় সেটা সময়ই বলে দিবে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেনের দেশগুলোর মতো ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রাণহানির হার বাড়তে থাকে তাহলে আমাদের যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটা সামাল দিতে তারা কি প্রস্তুত। সেজন্য দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
