বিশ্বজুড়ে নতুন করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) বিস্তার বাড়ছেই। এই মহামারী ঠেকাতে দেশে গত প্রায় দুই মাস ধরে চলছে অঘোষিত 'লকডাউন'। এর আগে হয়তো এই লকডাউন শব্দটি এদেশের অনেক মানুষেরই জানা ছিলো না। কিন্তু এর প্রভাব এখন সহজেই টের পাচ্ছেন এ দেশের হতদরিদ্র, নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির থাকায় কঠিন সংকটের মুখে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া এই মানুষেরা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার ২০ শতাংশই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ বা দিন মজুর। গত দুই মাস ধরে তারা কর্মহীন, উপার্জনহীন। যারা এতোদিন পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এখন কাজ না থাকায় তারা হাত পাততে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরবে-নিভৃতে অনাহারে দিন পার করছেন। প্রায় ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক দেশের এই নিম্নআয়ের মানুষের অন্তর্ভুক্ত। যারা সরকারি বা বেসরকারি কোন খাত থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার তালিকায় নেই। আর সবাই যখন একই সংকটে তখন অন্যের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করাটাও দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু এই কঠিন দুঃসময়ে হঠাৎ করেই কিছু সিএনজি অটোরিকশা চালকের পাশে দাঁড়িয়েছে বেসরকারী সংস্থা সুহানা এন্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশন (সাফ)। স্বল্প পরিচিত এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দেশের প্রায় তিন হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকের পরিবারে খাবারের সংস্থান হচ্ছে।
রাজধানীর শাহজাহানপুর কলোনিতে পরিবার নিয়ে থাকেন সিএনজি চালক রমজান আলী। তিনি বলেন, গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হতে না পারায় বড় কষ্টে দিন কাটছিল। টানা তিন দিন ঘরে খাবার ছিল না। সেই সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে সাফ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে একটি কল আসে। তারা জানায়, আমার বিকাশ অ্যাকাউন্টে অনুদান হিসেবে তিন হাজার ৭৫০ টাকা পাঠানো হয়েছে। জানতে চায়, আমি টাকাটা পেয়েছি কি-না। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।বিপদের সময়ে এই আর্থিক সহায়তা তার পরিবারকে বাঁচিয়েছে বলে মনে করেন রমজান আলী।
করোনা ভাইরাস সংকটের আগে মধ্য বয়সী রমজান সিএনজি চালিয়ে দৈনিক গড়ে আটশো' টাকা আয় করে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবনযাপন করতেন। রাইড শেয়ারিং ওভাই'য়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। কিন্তু ২৬ মার্চের পর অনানুষ্ঠানিক লকডাউন শুরুর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই সেই স্বাচ্ছন্দ্যটুকু হারিয়ে যায় তার। তিনি বলেন, আর কোনো বাবার সামনে যেন সন্তানরা অনাহারে না থাকে।
গত সপ্তাহে সাফ ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে দ্বিতীয় কিস্তির সহায়তা হিসেবে আরো তিন হাজার ৭৫০ টাকা পেয়েছেন চট্টগ্রামের সিএনজি চালক মোহাম্মদ রিপন। তিনি মোট পেয়েছেন সাড়ে সাত হাজার টাকা। এই টাকায় দুবেলা দুমুঠো খেয়ে দিন পার করছেন তার পরিবারের সদস্যরা। রিপন জানান, এই সংকটে বাসা ভাড়া দিতে পারেননি। কিন্তু সাফ এর সহায়তায় অন্তত খেয়ে বাঁচতে পারছেন। নোয়াখালীতে থাকা তার মাকেও কিছু টাকা পাঠিয়েছেন তিনি।
এই সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আরেকজন সিএনজি চালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘরের সবাই দিনে এক বেলা করে খাবার খাচ্ছিলাম। অভাবে যখন দিশেহারা অবস্থা তখন ফোন কল পেলাম। অপ্রত্যাশিত সহায়তা পেয়ে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এমন কিছু্ হতে পারে। শত অভাবের মাঝেও দুবেলা দুমুঠো খেয়ে এখন রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারছি।
সাফ-এর এই মহতী উদ্যোগে কৃতজ্ঞতা শুধু রফিকুল ইসলামের নয়, বরং তার মতো দেশের আরো প্রায় তিন হাজার সিএনজি চালকের। সিলেটের সিএনজি চালক মোহাম্মদ মানিক বলছেন, সাফ ফাউন্ডেশনের দেওয়া এই টাকায় আমরা ঈদের দিনটাতেও কিছু খেতে পারব। তার বিশ্বাস দেশের পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে এবং তিনি সিএনজি চালিয়ে আবারো পরিবারের হাল ধরতে পারবেন।
মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং সহায়তায় এগিয়ে আসার বিষয়ে সাফ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আনিস আহমেদ জানান, গত দুই মাসে দুই হাজার ৯৫৩ জন চালকের মধ্যে এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের সহায়তায় কাজ করা আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কিছু নয়। এই করোনা ভাইরাসের দুর্যোগের সময়ে চলতি মাসের শুরুতে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে মিলে সাফ ফাউন্ডেশন প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার ২২ হাজার পরিবারকে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার সহায়তা দিয়েছে।
ওভাই অ্যাপ আনিস আহমেদের মালিকানাধীন এমজিএইচ প্রতিষ্ঠানের একটি সহযোগী সংস্থা। ওভাই-এর চালকদের সহায়তা করাটা অনেকেই পারিবারিক বিষয়াদি বলে সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু এই চালকরা ওভাই-এর কর্মচারী নয়। তারা উবার ও পাঠাও-এর মতোই ওভাই-এর পক্ষ থেকে যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। আর বাস্তবতা হলো নিয়োগকর্তারা সাধারণত কর্মীদের পূর্ণাঙ্গভাবে দেখভাল করতে পারেন না। আনিস আহমেদ বলেন, আমরা হয়তো আরো অনেকভাবেই দাতব্য বা জনসেবামূলক কাজ করতে পারতাম। কিন্তু আমরা খুবই খুশি যে, এই সংকটের সময়ে সঠিক কাজটা করতে পেরেছি। তাদেরকেই সহায়তা করেছি, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আইনি দিক বিবেচনায়, এই সিএনজি চালকদের প্রতি ওভাই-এর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তবুও, ওভাই এই চরম সংকটের সময়ে সেই সব মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যারা এই সংকটের আগে তাদের জন্য কাজ করেছেন।
ইত্তেফাক/কেকে
