আমরা কি কড়াই হইতে জ্বলন্ত চুলায় পড়িব?

আপডেট : ২৮ মে ২০২০, ২১:৫৭

করোনাকে প্রতিহত করিতে সরকারি ছুটি শুরু হইয়াছিল ২৬ মার্চ হইতে। তাহার পর কয়েক দফায় বৃদ্ধির পর ৩০ মে অবধি টানা ছুটি ছিল। অতঃপর গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি হইয়াছে যে, ৩১ মে হইতে ছুটি আর বৃদ্ধি করা হইতেছে না। আসলে, ছুটির কোপে পড়িয়া অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যেই রক্তক্ষরণ হইতেছে, তাহাতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলিয়া যাইতে পারে, যাহার ক্ষতি হইবে সুদূরপ্রসারী। বলা যায়, একই সঙ্গে জীবন ও জীবিকাকে রক্ষা করিবার কঠিন কাজে মনোনিবেশ করিয়াছে সরকার। ইহা এক ভয়াবহ টানাপোড়েন।

এই দুর্বিষহ অবস্থা কেবল বাংলাদেশের নহে, সারা বিশ্বের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলিতেছে, করোনার প্রথম ঢেউ থাকিতে থাকিতেই দ্বিতীয় ঢেউয়ের বড়ো আঘাত আসিতে পারে। বিশ্বে করোনা আক্রান্ত এখন ৫৭ লক্ষেরও বেশি। মৃত প্রায় ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার পাশাপাশি ব্রাজিল, পেরুর মতো দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ করোনা ঝড়ের প্রথম ধাক্কাতেই বেসামাল। অর্থনীতিকে বাঁচাইতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্রাজিলও লকডাউনকে থোড়াই কেয়ার করিতেছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেরই প্রধান চিন্তা অর্থনীতি যেন এমন রক্তশূন্য হইয়া না পড়ে, যাহাতে করোনার পরোক্ষ অভিঘাতে অর্থাত্ মহামন্দায় আরো বেশি মানুষের মৃত্যু না ঘটে! বাংলাদেশও সম্ভবত পরীক্ষামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করিতে চাহিতেছে ৩১ মে হইতে ১৫ জুন অবধি। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৯ জন মানুষের শরীরে করোনা শনাক্ত হইয়াছে। ঈদের ছুটিতে আন্তঃজেলা যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কারণে যেই পরিমাণ মানুষ ঠেলাঠেলি করিয়া গ্রামের বাড়িতে গিয়াছে এবং তাহারা ঈদ শেষে পুনরায় রাজধানীতে ফিরিতেছে, তাহাতে আগামী কিছুদিনের মধ্যে দেশে করোনার ঝুঁকি আরো বাড়িবে বলিয়া মনে করিতেছেন বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ। এই অবস্থায় অনেকে প্রয়োজনে সরকারকে কারফিউ দেওয়ার পরামর্শ দিতেছেন। কিন্তু ঘটিয়াছে বিপরীত ঘটনা। শর্তসাপেক্ষে এবং সীমিত আকারে সকল সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিসগুলি নিজ ব্যবস্থায় খোলা হইতেছে। যদিও এই সময়ে এক জেলা হইতে আরেক জেলায় জনসাধারণের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকিবার কথা বলা হইয়াছে। তবে এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ অনেক ক্ষেত্রে বজ্র আঁটুনি ফসকা  গেরোর মতো হয়।

অনেকেই মনে করেন, সংক্রমণের বিস্তার ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ না করাটা আরো ভয়ংকর হইতে পারে। বিশ্বের যেই সকল দেশ শুরুতে ইহার গুরুত্ব অনুধাবন করিতে পারে নাই, তাহাদের মূল্য দিতে হইয়াছে অনেক বেশি। ইতালি, ব্রিটেন আর স্পেন এই ক্ষেত্রে বড়ো উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গতিবিধি দেখিয়া মনে হইতেছে, মৃত্যুর সংখ্যা যাহা-ই হউক, দেশটি তাহার অর্থনীতিকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতেছে। অনেকের মতে, ভারত আর ব্রাজিলেও একই পথে পা দিতাছে। অবস্থা বুঝিয়া মনে হইতেছে, আমরাও আগামী ১৫টি দিন নূতন পরীক্ষায় শামিল হইতে যাইতেছি। এই পরীক্ষায় আমরা তপ্ত কড়াই হইতে জ্বলন্ত চুলার মধ্যে পড়িব, নাকি নূতন পথের দিশা পাইব—তাহা সময়ই বলিবে।