খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টা কী?

আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ২১:৫৩

মো. ইব্রাহীম খলিল

 

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে খুব জোরালো একটি সম্পর্ক রয়েছে প্রাণীজ আমিষ বিশেষ করে দুধ, মাংস ও ডিম গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধিতে। গত ১০ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দানাদার খাদ্যের মাধ্যমে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ৬০ ভাগ থেকে দাঁড়িয়েছে ৫৪ ভাগ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে ২০৩০ সাল নাগাদ এটা আরো কমবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত চার দশকে মত্স্য থেকে উত্পাদিত খাদ্যসমূহ গ্রহণ সামান্য কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রাণিসম্পদ বিভাগের ওপরে অতিরিক্ত চাপ বাড়বে। এর একটি কারণ—খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য খাবারে অ্যামাইনো অ্যাসিডের যে চাহিদা আগে নিরূপণ করেছিল তা এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। গবেষণায় প্রমাণিত যে, প্রাণীজ আমিষ ওজন কমাতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখার পাশাপাশি কার্যকর শরীর গঠনে সহায়তা করে।

এবার আসি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০১৮-২০১৯-এর বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে—মাংস উত্পাদন ছিল ৭৫.১৪ লাখ মেট্রিক টন, দুধ ৯৯.৩ লাখ মেট্রিক টন ও ডিম ১৭১১ কোটি। গত এক দশকে দুধ, মাংস ও ডিম উত্পাদন বেড়েছে যথাক্রমে ৪.৩ গুণ, ৭ গুণ ও ৩.৬ গুণ, যেখানে জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদার বিপরীতে উত্পাদিত হচ্ছে প্রায় ১২৫ গ্রাম, ২৫০ মিলিলিটার দুধের চাহিদার বিপরীতে উত্পাদন হচ্ছে প্রায় ১৬৫ মিলিলিটার ও জনপ্রতি বছরে ১০৪টি ডিমের চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হচ্ছে। সমস্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ কথা বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঠিক পথেই রয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই আমাদেরকে আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রজেকশনের দিকে খেয়াল রেখে এই সেক্টরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আরো কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া একান্ত জরুরি—

১) প্রাণিসম্পদ উত্পাদিত পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে জরুরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে খামারিদের পাশে থেকে সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করা উচিত, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই মনে করে।

২) গ্রাম পর্যায়ে প্রাণীদের চিকিত্সা ও পরামর্শ সার্বক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাণিসম্পদসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।

৩) দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নত মানের গবেষণাগার ও পাবলিক হেলথ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা।

৪) দুধ, মাংস ও ডিমের উত্পাদন বাড়াতে জাতীয় ডেইরি ডেভলপমেন্ট করপোরেশন, জাতীয় পোল্ট্রি ডেভলপমেন্ট করপোরেশন ও জাতীয় বিফ ডেভলপমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব হবে।

৫) প্রাণিসমপদ অধিদপ্তরের ইপিডেমিওলজি ইউনিটকে আরো শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে খামারিদের উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার হাত থেকে অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

৬) খামারিদের উত্পাদিত পণ্য সুষ্ঠুভাবে বিপণনের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আলাদা বিপণন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যা এই মহামারির সংকটকালে খুব বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

দুধ, মাংস ও ডিম মানুষের মেধা বিকাশের অন্যতম হাতিয়ার। মেধাবী জাতি যদি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তবে মেধা-মননকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য সেক্টরকে এগিয়ে নিয়ে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব হবে ২০৪১ সালের আগেই।

ভেটেরিনারি সার্জন, এমএস ইন অ্যানিম্যাল অ্যান্ড পোলট্রি নিউট্রিশন