ড. শামসুল আলম
দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এই অবস্থায় সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক? এ প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। মনে রাখতে হবে, জীবন ও জীবিকা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কঠিন লকডাউনে সব কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে লকডাউন অবস্থা ধরে রাখতে পারছে না অনেক উন্নত দেশও। প্রযুক্তিতে উন্নত, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, আছে অঢেল সম্পদ সেই যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ প্রায় ১৮ লাখ, মৃত্যু লক্ষাধিক। সেই তুলনায় বাংলাদেশকে নিয়ে হতাশার যুক্তি কম। মানুষকে করোনা ভাইরাস থেকে যেমন বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যান্য গুরুতর রোগ, খাদ্য সংকট, আয় সংকট থেকে উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আগামীতে সাধারণ ছুটি আর না বাড়িয়ে সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক। কেননা একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটাকে বাঁচানো যায় না। লম্বা সময় ধরে লকডাউন বা কারফিউ চললে শুধু করোনায় নয়, চিকিত্সাহীন অন্যান্য গুরুতর রোগ আর ক্ষুধায় বহু লোক মরে যাবে। জাতিসংঘ একাধিকবার তীব্র খাদ্যসংকটের পূর্বাভাস দিয়েছে। কথা হচ্ছে—তাহলে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাবে কীভাবে?
করোনা ভাইরাস ঠেকাতে যত ধরনের সহযোগিতা সেটা সরকারকে দিতে হবে এবং দিচ্ছেও। জীবন রক্ষা সমর্থন, যত উপকরণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে আরো উন্নত কীভাবে করা যায়—সেগুলোতে মনোযোগ তো দিতেই হবে। অনেকের মতে, গোড়াতে দুর্বল ব্যবস্থাপনায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল নড়বড়ে। এটা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা গেলেও সেবা প্রাপ্তি এখনো অপর্যাপ্ত। বেসরকারি খাতকে করোনাসহ অন্যান্য চিকিত্সায় পুরোপুরি যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিকের বড়ো বড়ো ডাক্তারের অনেকেই দুই মাসের অধিক ছুটি কাটাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে মনিটর করতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রিত। স্বাস্থ্যসেবার এই বিপুল চাহিদার সময়ে করোনা চিকিত্সার মূলধারায় তাদের আনতেই হবে। একটি পক্ষ কঠিন লকডাউনের পক্ষে। তাদের বক্তব্য, অর্থনীতির ক্ষেত্রে শিথিলতার সময় আসেনি। এক্ষেত্রে তারা নানা যুক্তি দিচ্ছেন এবং বলছেন সংক্রমণ বৃদ্ধির এই সময়ে শিথিলতা ঠিক হচ্ছে না। যদিও নিশ্চিত করে কেউ জানে না এ সংক্রমণ কতদিন থাকবে।
প্রতীয়মান হয়, পূর্ণ লকডাউনের পক্ষে দেশের ধনিকশ্রেণি, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিজীবী। তারাই লকডাউনের কথা বলে, যাদের পর্যাপ্ত সঞ্চয় আছে, সম্পদ আছে, বেতন আছে, পেনশনের টাকা আছে কিংবা কাজ না করলেও লম্বা সময় চলতে পারবে। লকডাউনকে অবমূল্যায়ন করছি না। তবে সেটি হতে হবে স্থান ভেদে। যেখানেই সংক্রমণ দেখা দেবে, সেখানটা আটকিয়ে ফেলা। একেবারে সারাদেশ লকডাউন দিয়ে বসে থাকার মতো আর্থসামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের নেই বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। তবে আবারও বলছি, জীবন রক্ষায় লকডাউনকে অবমূল্যায়ন নয়, তবে সংক্রমণ রোধে প্রচুর টেস্ট ও ট্রেসিং দরকার, আইসোলেশন দরকার, চিকিত্সা সুবিধা দরকার। যেখানে সংক্রমণ হবে, সেখানেই স্থানিক লকডাউন কার্যকর করতে হবে কঠোরভাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, স্থানভেদে বা আংশিক লকডাউন করে বাংলাদেশ কি কোনো সুফল পেয়েছে? সুফল পেয়েছি। ঢাকার টোলারবাগ, নারায়ণগঞ্জে সংক্রমণ আর বাড়েনি তেমন। আজকে আমরা পূর্ণ লকডাউন দিয়ে কৃষিতে যদি তা কার্যকর করতাম, কী অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখুন! এত ফসল আমরা কি কাটতে পারতাম, ২২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করতে পারতাম? এই যে ঢাকা শহরেও কোনো পণ্যের যে অভাব হয় নি, এর কারণ কী। কারণ সরবরাহ সিস্টেমটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছিল এবং এ সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক। যদি কড়া লকডাউন দিয়ে দেওয়া হতো, কারফিউ থাকত, ঢাকা শহরের কী উপায় হতো? এজন্য ধনিক ও উচ্চ আয় শ্রেণির কথা শুনলেই শুধু হবে না, যারা কর্ম হারিয়েছে, যারা বস্তিবাসী, দরিদ্র-গতর খাটা মানুষ, তারা কী চায় সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। যদি আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে সবার মতামতকে এই জাতীয় সংকটেও মূল্য দিতে হবে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির, বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত, এই অবস্থায় দেশের কর্মহীন ঢাকায় শুধু রিকশা চালু থাকে তাহলে ১ কোটি পরিবারের আয়ের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এটা সোজা বিষয় না, ১ কোটি লোকের জীবন চলার মতো আয়ের ব্যবস্থা করা। রয়েছে ১ কোটির ওপর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মচ্যুত শ্রমিক। এজন্য কর্মহীন মানুষের জীবিকা হেলাফেলা করা যাবে না।
তার পরও অনেকে বলবেন, ইউরোপ-আমেরিকার মতো গণসংক্রমণ পরিহার করতে পারব কি না! ইউরোপ-আমেরিকা পারেনি। পারেনি বলেই যুক্তরাষ্ট্রের এক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বলেছেন, ‘করোনায় আমার মৃত্যু হোক, অর্থনীতির মৃত্যু আমি ঘটতে দেব না।’
দেশে দেশে অবশ্যই ভিন্নতা আছে। জনঘনত্বে গণসংক্রমণের নজির এখনো আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কী হয়েছে? সেখানে তো লাখ লাখ লোকের জনসমাগম হয়েছিল, দুবার করে লাখ লাখ শ্রমিক কীভাবে ঢাকায় এলো, কীভাবে গেল? এবারের ঈদেও লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। সাড়ে তিন লাখ কৃষিশ্রমিক স্থানান্তরিত হয়েছে, কোথাও কি গণসংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে? ভাবার বিষয়। তবে এটাকে আমি অবমূল্যায়ন করছি না। কিন্তু যেভাবে আমরা সংক্রমণে ভীত ছিলাম, সেরকম হয়নি। আমাদের কৌশল তাহলে ব্যর্থ কোথায়? যাই হোক, সারা বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে করোনা দুই-তিন মাসের বিষয় নয় যে কঠিন লকডাউন দিয়ে পার পেয়ে যাব, করোনা নিয়েই আমাদের বসবাস করতে হবে, অন্তত এ বছরের শেষ পর্যন্ত। এটাই বাস্তবতা।
আমার ধারণা, বাংলাদেশের মানুষের ইমোনাইজেশন (রোগের প্রতিরোধক্ষমতা) অনেক বেশি। সম্ভবত সবাই কমবেশি দূষিত পরিবেশে বেড়ে উঠেছি, হয়তোবা সে কারণেই। উন্নত দেশের মানুষের চাইতেও রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি। আমাদের দেশে ধনীদের চাইতে গরিবের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি। এটা বলা যায়। আমি অনেকগুলো ঘটনার কথা বললাম, এর বাইরে ঢাকার লাখ লাখ বস্তিবাসী জড়াজড়ি করে বাস করছে। আমরা গণহারে সংক্রমিত হতে দেখিনি।
ঢাকা শহরে বস্তিতে থাকে লাখ লাখ মানুষ। ঘিঞ্জি পরিবেশ, একটা টয়লেট ২০-২৫ জন শেয়ার করে। কিন্তু কোনো বস্তিতে আল্লাহর রহমতে গণসংক্রমণের খবর আসেনি। তবে এটার মানে এই নয় যে কোনো প্রকার শিথিলতার সুযোগ আছে। গত তিন মাসে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের ইমিউনিটি অনেক ভালো। সংকটের এটা ইতিবাচক দিক অবশ্যই।
এবার করোনার দুর্যোগে দেশের প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্র যথেষ্ট সক্রিয়তার পরিচয় দিয়েছে, যেটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যাপক শ্রম দিয়েছেন, মানুষের জন্য কাজ করেছেন। অন্যদিকে বহু অর্থনীতিবিদ ও থিংক ট্যাংকদের পরামর্শের অনেক আগেই সরকার অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। শুধু ঘোষণাই দেয়নি, তার যথাযথ বাস্তবায়ন করছে। ১ কোটি মানুষকে খাদ্য ও নগদ সহায়তা প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা—সবই হয়েছে ত্বরিত গতিতে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব ও প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্রের আন্তারক প্রচেষ্টা বড়ো ভূমিকা রেখেছে। এতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বেড়েছে। মানুষ আশান্বিত হয়েছে যে সরকার তাদের পাশে আছে। সবাই মোটামোটি প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে। কিছু দুর্নীতিবাজ লোক সব সময়ই থাকে। এর মধ্যে আড়াই শ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন। এটা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। দুই মাসের মতো সময়ে এত বেশিসংখ্যক জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত করার নজির আগে ঘটেনি।
এটা স্পষ্ট হয়েছে যে একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম, যেখানে বেসরকারি খাত একটি ভালো বিকশিত অবস্থায় ছিল বলে বলা হচ্ছিল। কিন্তু এই করোনায় তাদের তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তবে এখন সময় এসেছে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে ঢেলে সাজানোর। করোনার এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিশ্চয় সরকার এই উদ্যোগ নেবে। এই উদ্যোগ সফল করতে বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিতে হবে। প্রায় ৭০টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকেও করোনা চিকিত্সাসেবায় সংযুক্ত করা প্রয়োজন। এত বড়ো জনগোষ্ঠীর চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার।
সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করে দেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, আরো এগিয়ে যাওয়ার পথও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে সেই পথে বড়ো বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এই অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে বাজেট ঘোষণা করতে হচ্ছে। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, শিক্ষার মান ও বাজারব্যবস্থা জোরালো করতে পরিবহনব্যবস্থার বিষয়টিতে অধিক গুরুত্ব দিতেই হবে। স্বাস্থ্য খাতে স্বয়ম্ভর হওয়ার শিক্ষাটাই করোনা আমাদের দিয়ে যাবে হয়তো অনেক জীবনের বিনিময়ে।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ
